ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রে উল্টো বাড়বে পেট্রলের দাম: মরগান স্ট্যানলি
যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ছোঁয়া ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে—ট্রাম্প প্রশাসন যদি ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে, তবে দেশটিতে গ্যাসোলিন বা পেট্রলের দাম উল্টো আরও অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা। ডিজেল রপ্তানি বন্ধের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াশিংটনে যখন তীব্র বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই এই নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি সামনে এলো।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে প্রকাশিত মরগান স্ট্যানলির এক নোটের বরাত দিয়ে ব্যাংকটির বিশ্লেষকরা জানান, "মার্কিন শোধনাগারগুলো (রিফাইনারি) যদি তাদের জ্বালানি প্রক্রিয়াকরণ বা উৎপাদন হার কমিয়ে দেয়, তাহলে ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিপরীত প্রভাব দেখা যেতে পারে—যা বাজারে গ্যাসোলিনের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।"
মরগান স্ট্যানলির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিজেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে—মার্কিন শোধনাগারগুলোতে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উদ্বৃত্ত ডিজেল সংরক্ষণের জায়গা বা স্টোরেজ পুরোপুরি পূর্ণ হয়ে যাবে। ধারণক্ষমতা না থাকায় বাধ্য হয়ে শোধনাগারগুলোকে তাদের দৈনিক তেলের প্রক্রিয়াকরণ বা উৎপাদন হার (ইউটিলাইজেশন রেট) কমিয়ে দিতে হবে। আর যেহেতু অপরিশোধিত তেল শোধনের সময় ডিজেল এবং গ্যাসোলিন (পেট্রল) একসঙ্গেই উৎপাদিত হয়, তাই শোধনাগারের সার্বিক উৎপাদন কমলে গ্যাসোলিনের সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।"
এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে, ইতোমধ্যেই রেকর্ড উচ্চতায় থাকা পেট্রলের দাম নতুন করে আবার উল্লম্ফন করবে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পর্যায়ে সাধারণ গ্যাসোলিন বা পেট্রলের জাতীয় গড় দাম ছিল—প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৪৭৪৪ মার্কিন ডলার। এক মাস আগেও এই দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ১০ ডলার, যা গত বছরের (২০২৫) এই সময়ে ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১৭ ডলার। অন্যদিকে, দেশটিতে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫২ ডলারে, যা ২০২৫ সালের একই সপ্তাহে ছিল ৩ দশমিক ৬৯ ডলার।
যদিও এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) স্কট বেসেন্ট ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তবে বুধবার হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে আপাতত এ ধরনের কোনো প্রস্তাব বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে না।
বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের আকাশচুম্বী মূল্যের প্রেক্ষাপটে, আইওয়ার সেনেটর চাক গ্রাসলির নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টির একদল সিনেটর ডিজেল রপ্তানি বন্ধের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, ডিজেলের এই রেকর্ড মূল্য মার্কিন কৃষক এবং পরিবহন খাতের ট্রাক চালকদের মারাত্মক আর্থিক সংকটে ফেলছে।
তবে রপ্তানি বন্ধের এমন জল্পনা-কল্পনা ও খবরে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি এবং শিল্প উৎপাদন খাতে তীব্র ক্ষোভ ও বিরোধিতার সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির সাবেক তেলখাতের নির্বাহী ও বর্তমান মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বুধবার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার মতো ভোঁতা ও কঠোর পদক্ষেপ, নীতি হিসেবে একেবারেই কার্যকর নয়।"
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জ্বালানি রপ্তানিতে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ না আরোপ করার অনুরোধ জানিয়ে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টিরও বেশি ব্যবসায়ী, জ্বালানি ও উৎপাদনকারী সংগঠন যৌথভাবে একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে শিল্পনেতারা সতর্ক করে বলেছেন, "রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে দেশে সার্বিক জ্বালানি উৎপাদন কমে যাবে, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সংকুচিত হবে এবং পরিশেষে তা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ পরিবার, কৃষক ও ট্রাক চালকদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।"
