ক্রিকেটে ফের রাজনীতি: পাকিস্তানি মন্ত্রীর হাত থেকে এশিয়া কাপের ট্রফি নিল না ভারত
দুবাইয়ে নারী এশিয়া কাপ ক্রিকেটের ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন ভারত এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটল।
গত রবিবার ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নদের কাছ থেকে মুকুট পুনরুদ্ধার করে ভারত। তবে ম্যাচ-পরবর্তী অনুষ্ঠানটি ৪৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে বিলম্বিত হয়, কারণ দুই দলের খেলোয়াড়েরা নিজ নিজ ড্রেসিংরুমের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।
দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ম্যাচটি রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে শেষ হলেও, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হতে রাত ১০টা বেজে ৪০ মিনিট হয়ে যায়।
পুরস্কার প্রদানের জন্য অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি হওয়ার পর অনুষ্ঠান শুরু হলে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নাকভিকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়েরা মেডেল নেওয়ার জন্য এগিয়ে যাওয়ার আগে ম্যাচ অফিশিয়ালদের প্রথম তাঁদের মেডেল প্রদান করা হয়।
শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক চামারি আতাপাত্তু নাকভির হাত থেকে রানার্সআপ পুরস্কার গ্রহণ করেন এবং এরপর তাঁর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলেন।
তবে ম্যাচসেরা ও টুর্নামেন্টসেরার মতো কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কার দেওয়া হয়নি এবং ভারতীয় দলকেও তাদের মেডেল বা ট্রফি নেওয়ার জন্য ডাকা হয়নি।
রেকর্ড অষ্টমবারের মতো এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছে ভারত।
টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোতে ট্রফি উদযাপনের কোনো ছবি পোস্ট করা হয়নি।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ফাঁকা স্টেডিয়ামে তোলা দল ও কোচিং স্টাফের একটি গ্রুপ ছবি পোস্ট করা হয়।
ভারত কেন ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানাল?
সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, অনুষ্ঠানের আগে ভারতীয় দল ও সাপোর্ট স্টাফেরা ড্রেসিংরুমের বাইরে একটি বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছেন। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর তাঁদের মঞ্চের কাছাকাছি দেখা যায়নি এবং তাঁদের অনুপস্থিতির বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।
ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ অমল মুজমদার জানান, ট্রফি গ্রহণ না করার এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই।
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় দল কেন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এই অবস্থানটি বিসিসিআই নিয়েছে এবং আমরা এর সঙ্গেই আছি।'
মুজমদার আরও যোগ করেন, 'টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে। আমরা চ্যাম্পিয়ন, এবং (আমাদের জন্য) এটুকুই যথেষ্ট।'
টুর্নামেন্টের আয়োজক এসিসি এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
এই দৃশ্যটি গত সেপ্টেম্বরের অনুরূপ একটি ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন ভারত একই ভেন্যুতে পুরুষদের এশিয়া কাপ ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে জিতেছিল কিন্তু সেবারও এসিসি প্রধান নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করেছিল, যিনি তখনও এসিসি প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডেরও (পিসিবি) চেয়ারম্যান।
পুরুষদের ফাইনালের এই বিতর্কের ঠিক পরপরই বিসিসিআই চেয়ারম্যান দেবাজিৎ সাইকিয়া নিশ্চিত করেছিলেন যে নাকভির উপস্থিতি অনুষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তিত্ব হওয়ায় ভারত ট্রফি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
সাইকিয়া সে সময় ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, 'আমরা এসিসি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে এশিয়া কাপের ট্রফি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যিনি পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতাও বটে।'
জটিল ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। তবে ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পর্যটনস্থল পাহালগামে গত ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল সশস্ত্র হামলাকারীদের গুলিতে ২৬ জন পুরুষ নিহত হওয়ার পর এই সম্পর্ক আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিদার সশস্ত্র গোষ্ঠী 'দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট' (টিআরএফ) এই হামলার দায় স্বীকার করে। ভারতের অভিযোগ, টিআরএফ পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী লস্কর-ই-তাইয়েবা (এলইটি)-র একটি শাখা, যা ইসলামাবাদ অস্বীকার করে।
এই হামলার পর দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক কমিয়ে আনে এবং ভারত সিন্ধু পানি চুক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ স্থগিত করে।
২০২৫ সালের মে মাসের ৭ তারিখে 'অপারেশন সিন্দুর' নামে ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ভারত জানায় তারা পাকিস্তানে নয়টি স্থানে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তান জানায় এতে বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এর তিন দিন পর পাকিস্তান 'অপারেশন বুনিয়ান মারসুস' পরিচালনা করে কমপক্ষে ছয়টি ভারতীয় সামরিক সাইটকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং এতে অন্তত পাঁচজন ভারতীয় নিহত হন বলে জানায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
একই দিন দুই পক্ষ অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায়, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনা কি ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটকে প্রভাবিত করেছে?
২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তান ক্রিকেট দলের—পুরুষ, নারী কিংবা জুনিয়র—যেকোনো সাক্ষাৎ উভয় পক্ষের মধ্যকার তিক্ততায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের পুরুষদের এশিয়া কাপের সময় ভারতীয় দল ম্যাচ শুরুর আগের টস এবং ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় পাকিস্তানি প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে হাত মেলানো থেকে বিরত থাকে। টুর্নামেন্টে দলগুলো তিনবার মুখোমুখি হয়েছিল এবং খেলোয়াড়দের একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন আচরণের কারণে তা অত্যন্ত রাজনৈতিক রূপ নেয়।
শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপ ২০২৫-এ যখন পাকিস্তান ভারতের মুখোমুখি হয়, তখন দলগুলো হাত মেলানো থেকে বিরত থাকে এবং চলতি বছরের শুরুতে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও এই চর্চা বজায় রাখে, যা নারী এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও দেখা গেছে।
পুরুষদের এশিয়া কাপ ফাইনালের এই বিশৃঙ্খলার পর রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আল জাজিরাকে জানান যে, এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি 'অনিবার্য' বলেই মনে হচ্ছিল।
ভারত ও পাকিস্তানের পরবর্তী ক্রিকেট ম্যাচ কবে?
উভয় দেশই জাপানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন এশিয়ান গেমসের পুরুষ ও নারী টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করবে।
দলগুলো সরাসরি নকআউটে প্রবেশ করায় প্রাথমিক পর্বে একই গ্রুপে না থাকলেও, উভয় প্রতিযোগিতায় ভারত বনাম পাকিস্তান ফাইনাল ম্যাচের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
