লোকসানি স্টিল মিল থেকে যেভাবে রপ্তানি হাবে রূপান্তরিত হলো কর্ণফুলী ইপিজেড
দুই দশকে কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে এখানে সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের।
লোকসানে থাকা চট্টগ্রাম স্টিল মিলস ১৯৯৯ সালে ৯৮০ কোটি টাকার দায় নিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এর জায়গাতেই গড়ে তোলা হয় কর্ণফুলী ইপিজেড।
চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় ২০৯ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা কর্ণফুলী ইপিজেড ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে এখানে ২৫৮টি প্লট ও পাঁচটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি ভবন ছিল। শ্রমিক কর্মরত ছিলেন মাত্র ১৭৪ জন এবং বিনিয়োগ ছিল ১৯ লাখ ১০ হাজার ডলার।
২০০৭-০৮ অর্থবছরে এখান থেকে প্রথম রপ্তানি শুরু হয়। ওই বছর পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লিমিটেড ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্ণফুলী ইপিজেডে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার ডলারে।
একই সময়ে কর্মসংস্থান বেড়ে হয়েছে ৭৭ হাজার ৪৬৫ জন। এর মধ্যে ৩৫৮ জন বিদেশি নাগরিক। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ ইপিজেডের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১৬ কোটি ডলারে।
কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ইপিজেডটির কৌশলগত অবস্থান এবং বেপজার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখানে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দুই হাজার শ্রমিকের বন্ধ কারখানা থেকে প্রায় ৮০ হাজার কর্মসংস্থান
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদীর তীরে ১৯৬৭ সালে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু করে চট্টগ্রাম স্টিল মিলস। একসময় কারখানাটিতে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।
তবে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়নের অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে কারখানাটি। একপর্যায়ে এটি লোকসানে পড়ে।
১৯৯৮ সালে কারখানাটি লে-অফ ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ হওয়ার সময় সেখানে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
চট্টগ্রাম স্টিল মিলস চালু থাকার সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সালামত উল্লাহ টিবিএসকে বলেন, "আধুনিকায়নের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার কারণে কারখানাটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। পুরোনো 'ওপেন হার্থ' প্রযুক্তিতে উৎপাদনের কারণে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহারও ছিল বেশি।"
তিনি বলেন, "একই সময়ে বাজারে জাহাজভাঙা স্ক্র্যাপের ব্যবহার বাড়তে থাকায় ইস্পাত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এই কারখানার বিলেট কেনায় আগ্রহ হারায়। কেবল বিএসআরএম ও ন্যাশনাল আয়রন কোম্পানি এখান থেকে বিলেট নিত, যা এত বড় একটি কারখানা সচল রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এর সঙ্গে শ্রমিকদের দলাদলি ও কাজে অবহেলাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।"
সালামত উল্লাহ বলেন, একপর্যায়ে কারখানাটির ব্যাংকঋণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরে ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বন্ধ কারখানাটির জায়গায় একটি ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেন।
বেপজার তথ্যমতে, ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কর্ণফুলী ইপিজেড উদ্বোধন করেন।
মাত্র ১৭৪ জন শ্রমিক ও ১৯ লাখ ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা ইপিজেডটির বিনিয়োগ ২০১১-১২ অর্থবছরে বেড়ে ২১ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছায়। তখন কর্মসংস্থান ছিল ২৬ হাজার ৮৩০ জনের এবং মোট রপ্তানি দাঁড়ায় ৪৮ কোটি ৯০ লাখ ১০ হাজার ডলারে।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ বেড়ে হয় ৪৩ কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার ডলার। কর্মসংস্থান পৌঁছায় ৬৩ হাজার ১১৮ জনে এবং মোট রপ্তানি ২৯২ কোটি ৯০ লাখ ডলারে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ আরও বেড়ে ৬১ কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। তখন কর্মসংস্থান ছিল ৬৯ হাজার ৩৬৪ জন এবং মোট রপ্তানি পৌঁছায় ৬৭৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে।
বর্তমানে ইপিজেডটিতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সরাসরি কাজ করছেন, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। এছাড়া এর মাধ্যমে এক লাখের বেশি মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে।
ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ২৩৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান এবং বিনিয়োগ ও উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কর্ণফুলী ইপিজেড আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
পরিবেশগত টেকসইতাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে ইপিজেড কর্তৃপক্ষ। বর্ষায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে সংরক্ষণ করা হয় এবং গ্রীষ্মে সেই পানি উত্তোলন করা হয়। এছাড়া ইপিজেডের ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে।
রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি
২০২১-২২ অর্থবছরে কর্ণফুলী ইপিজেডে এক বছরে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ আসে। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিনিয়োগ কমে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ডলারে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ কোটি ২ লাখ ৯০ হাজার ডলারে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ডলারে নেমে আসে।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে ২ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়।
কর্মকর্তারা বলছেন, ইপিজেডের সব জমি ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে।
অন্যদিকে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইপিজেডটি ১৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ১৮৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পৌঁছায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ১০১ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমে এলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ১২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ১২৩ কোটি ডলারের পণ্য।
বেপজার কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের সেরা ইপিজেডের স্বীকৃতি পায় কর্ণফুলী ইপিজেড।
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য
একসময় দেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর থাকলেও ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর রপ্তানি পণ্যে ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য এসেছে। কর্ণফুলী ইপিজেডেও তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি হচ্ছে।
এখান থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, আসবাব, ব্যাগ, অন্তর্বাস এবং ফ্যাশন ও সেফটি জুতা।
এসব পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে টিম্বারল্যান্ড, এইচঅ্যান্ডএম, জারা (ইন্ডিটেক্স), ইউনিক্লো (ফাস্ট রিটেইলিং), নেক্সট, নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমা, ডেকাথলন ও রালফ লরেন।
বেপজার তথ্যমতে, বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে ৪১টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন, তিনটি দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন এবং নয়টি দেশীয় মালিকানাধীন। এছাড়া আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি চীন—তাইওয়ান ও হংকংসহ—দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়াসহ মোট ১৩টি দেশের বিনিয়োগকারীরা কর্ণফুলী ইপিজেডে কারখানা স্থাপন করেছেন।
