রুশ ডেভেলপাররা ‘কামিকাজে’ ড্রোন তৈরিতে এআই ব্যবহার করেছে: অ্যানথ্রোপিক
রাশিয়ায় সম্ভবত ফ্রিল্যান্স ডেভেলপারদের একটি ছোট দল স্বয়ংক্রিয় ফার্স্ট-পার্সন-ভিউ (এফপিভি) 'কামিকাজে' ড্রোনের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করতে 'ক্লড' ব্যবহার করেছে। এমন তথ্য জানিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চ্যাটবট 'ক্লড'-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক।
এই সফটওয়্যারের কাজের মধ্যে ছিল লক্ষ্যবস্তুর দিকে ড্রোন পরিচালনা, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং একাধিক আকাশযানের মধ্যে সমন্বয় সাধন। রাষ্ট্রীয়-পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত নজরদারি ও অপপ্রচারমূলক কাজে ক্ষতিকর ব্যবহারকারীরা কীভাবে তাদের 'ক্লড এআই' ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে প্রকাশিত ১৫৪ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের ওপর নির্ভর না করে ড্রোনগুলোকে নিজস্ব লক্ষ্যবস্তু বাছাই করা এবং সেগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো করে প্রোগ্রাম করা হয়েছিল।
নিজেদের প্রোগ্রামিংয়ে সেই ফ্রিল্যান্স দলটি বারবার ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের একটি স্থানকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয় এবং অ্যানথ্রোপিকের ভৌগোলিক নিষেধাজ্ঞা বা জিও-ব্লক এড়াতে ভিপিএন ব্যবহার করে। উল্লেখ্য, ছোট আকৃতির এসব ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অ্যানথ্রোপিক আরও দেখতে পেয়েছে, সাইবার অপরাধী ও রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকাররা সাইবার হামলার একটি বড় অংশ পরিচালনা ও বাস্তবায়নে ক্রমেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছে, যার মধ্যে ইউক্রেনের সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর পরিচালিত হামলাও রয়েছে। অ্যানথ্রোপিক জানায়, একটি হ্যাকিং গ্রুপ ইউক্রেন সরকার, সামরিক ও কূটনৈতিক খাতের লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিরুদ্ধে ফিশিং, হোটেলের ওয়াই-ফাই হাইজ্যাকিং এবং হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট দখলের মতো অপারেশন পরিচালনা করে, যার প্রায় প্রতিটি ধাপে এআই ব্যবহার করা হয়েছিল।
রয়টার্স জানিয়েছে, এই গ্রুপটির কৌশল ও কাজের ধরন রাশিয়াভিত্তিক হুমকি সৃষ্টিকারী দল 'মিডনাইট ব্লিজার্ড'-এর সাথে মিলে যায়, যাকে মার্কিন সরকার এর আগে রাশিয়ার বৈদেশিয় গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআর-এর সাথে যুক্ত করেছিল। ওয়াশিংটনে অবস্থিত রুশ দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে মন্তব্যের কোনো অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
অভিযোগ রয়েছে যে, গ্রুপটি এআই ব্যবহার করে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছিল যা তাদের প্রস্তুতকৃত ম্যালওয়্যার সাইবার নিরাপত্তায় ধরা পড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারত এবং শনাক্তকরণ না এড়ানো পর্যন্ত সেই কোডটি বারবার নতুন করে লিখত।
অ্যানথ্রোপিকের এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার বোমাবর্ষণ তীব্রতর হওয়ার সাথে সাথে জেট-চালিত ড্রোনের নতুন তরঙ্গে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প হামলার শিকার হয়েছে। শহরের মেয়র ভিটালি ক্লিটসকো জানান, শুক্রবার সকালে দুটি পেট্রোল পাম্পে চালানো হামলায় অন্তত দুইজন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবারও একইভাবে একটি পেট্রোল পাম্পে হামলা চালানো হয়েছিল, যার পরপরই কর্মব্যস্ত সময়ে এই জোড়া হামলা চালানো হয়। তিনটি হামলাই 'উকরনাফতা' নামক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানের পেট্রোল পাম্পগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। রাশিয়ার ড্রোনের আঘাতে ধ্বংস হতে পারে—কিয়েভের এমন ১৮টি পেট্রোল পাম্পের একটি তালিকা বুধবার থেকে টেলিগ্রামে ঘুরছিল। এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পাম্পই সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন সংঘাতের জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেন, মস্কোর ওপর পশ্চিমাদের অনবরত চাপ সৃষ্টি এবং ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে "টেনে তোলার" চেষ্টাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পুতিন বলেন, 'বর্তমানে ইউরোপে যা কিছু ঘটছে তা মূলত রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে থাকা পশ্চিমা বিশ্বায়নকারীদের পদ্ধতিগত ভুলেরই ফসল। ২০১৪ সালে ইউক্রেন থেকে রাশিয়া-বান্ধব এক প্রেসিডেন্ট পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পর, পশ্চিমা বিশ্ব "তাৎক্ষণিকভাবে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য স্থির করে। আর এটিই পরিশেষে ইউক্রেনের আজকের ট্র্যাজিক বা হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।'
তিনি আরও বলেন, ইউরোপের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে আসলে কী ঘটছে, আর এ কারণেই তারা জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট অঙ্গরাজ্যের 'এএফডি'-এর মতো চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দিচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা শুক্রবার জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে হিউস্টনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জি-২০ জ্বালানি বিষয়ক একটি বৈঠকে এক রুশ কর্মকর্তা অংশ নেবেন। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে উত্তর ক্যারোলিনায় অনুষ্ঠিত জি-২০ দেশের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী অ্যান্টন সিলুয়ানভকে স্বাগতম জানানো হয়, যা ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করে।
কারণ ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর এই প্রথম কোনো রুশ অর্থমন্ত্রী সরাসরি সশরীরে সেই ফোরামে উপস্থিত ছিলেন। ইইউ-এর নিরীক্ষকরা চলতি মাসে জানান যে, শীতের মুখে গ্যাস মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া এবং রাশিয়ান তেল ও গ্যাসের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানোর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রচেষ্টা হোঁচট খাওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই বৈঠকটি হতে যাচ্ছে।
মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস আগামী সপ্তাহে রাশিয়ার ওপর একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা বিল বা প্রস্তাব বিবেচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও সেনেটে বিলটি নিরঙ্কুশ সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও হাউসে পাস হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা অনিশ্চিত।
এই বিলটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসতে পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তবে, একাধিক শীর্ষ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, এই পদক্ষেপটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেবে এবং তিনি সেই নতুন ক্ষমতার অপব্যবহার করে মার্কিন মিত্রদেশগুলোর ওপর চড়াও হতে পারেন।
আঞ্চলিক গভর্নরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক ও জাপোরিজিয়া অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বের খারকিভে পৃথক দুটি রুশ বিমান হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। রাশিয়া গত দুই সপ্তাহ ধরে দ্রুতগতির জেট-চালিত ড্রোন দিয়ে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে আসছে, যার ফলে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা নিহত হয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে রাতে তুলা অঞ্চলে দুজন এবং শুক্রবার কুরস্ক অঞ্চলে একজন নিহত হয়েছেন।
