উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে যান ট্রাম্প—এমনটাই চায় এশিয়ার তেল খাত, কিন্তু জানে লাভ নেই চেয়ে
ইরান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বর্তমান সংকট কীভাবে শেষ করা যায়, সে সম্পর্কে এশিয়ার অপরিশোধিত তেল শিল্পের ভালো ধারণাই রয়েছে। কিন্তু তারা এ-ও জানে যে তাদের এই চাওয়া পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, আর তাই তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত অ্যাপেক সম্মেলনে হাজার হাজার আলাপচারিতার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয়টি ছিল—কীভাবে হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ ও টেকসইভাবে পুনরায় উন্মুক্ত করা যায়। এর উত্তরটি ছিল লক্ষণীয়ভাবে একই রকম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করার পর যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে, তা আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের মতো করে সমাধানের সুযোগ দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পিছু হটতে হবে এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হবে।
কিন্তু সম্মেলনে এই বিষয়েও সবাই মেনে নিয়েছিল যে এমন ফলাফল আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে এবং এই সংঘাত কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানোর কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না।
বিমান হামলা শুরু হওয়ার আগে, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্তকারী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য এবং সমপরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হতো।
সংঘাত শুরুর পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে এই নৌপথ দিয়ে পারাপারের চেষ্টা করা জাহাজগুলোতে আক্রমণের হুমকি দেয় তেহরান। এতে তেলের সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। পরবর্তীতে এটি কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও এখনো তা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম।
বর্তমানে ঠিক কী পরিমাণ তেল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে এবং উপসাগরের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বন্দরে বিকল্প পথে কী পরিমাণ তেলের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে ইতিবাচক পরিসংখ্যান অনুযায়ীও এটি যুদ্ধপূর্ব সময়ের মাত্র ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি, যার অর্থ হলো বিশ্ববাজারে বর্তমানে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কম রয়েছে।
যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করা আরও কঠিন, তা হলো—পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে এশিয়ায় হালকা ও মাঝারি ডিস্টিলেট বা পরিশোধিত জ্বালানির আমদানি সংঘাত-পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বা দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল কম রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে আসল সংকটটি মূলত পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহে।
তেল ও গ্যাস খাত শুরুতে আত্মবিশ্বাসী ছিল যে ইরানের সাথে সংঘাতটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, বা খুব বেশি হলে কয়েক মাসের মধ্যে মিটে যাবে।
সেই আশা এখন মিটে গেছে। আর মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদক, ট্রেডিং হাউস, শিপিং কোম্পানি এবং রিফাইনারদের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাপেক প্রতিনিধিরা এখন আলোচনা করছেন কীভাবে এই দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবিলা করা যায়।
সাধারণ ধারণা হলো সংঘাতটির সমাধান হবে একটি রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে, তবে এটি ঘটার সম্ভাবনা কম কারণ এটি এখন একটি 'অহংকারের যুদ্ধে' রূপ নিয়েছে।
ট্রাম্পকে এমন এক অবস্থানে দেখা হচ্ছে যেখানে বিজয় হিসেবে দাবি করা যায় এমন কিছুর চেয়ে কম কোনো কিছু তিনি মেনে নিতে অপারগ। আর একই কথা প্রযোজ্য তেহরানের কট্টরপন্থি নেতাদের ক্ষেত্রেও, যারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চান এবং বোমা হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পুনর্নির্মাণের জন্য শত শত কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চান।
এক প্রতিনিধি আলাপচারিতায় যেমনটি বলেছেন: 'আমাদের একটি রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন, তবে তার জন্য ওয়াশিংটন বা তেহরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে হবে।' এই পরিবর্তনটি কোথায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি—পরবর্তীতে এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হয় ওয়াশিংটন, যা অ্যাপেক সম্মেলনে অনেকেরই সাধারণ ধারণা ছিল।
ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হতে আরও আড়াই বছর লাগতে পারে, যদিও আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে সফল হলে তার ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে তেল শিল্প সর্বোচ্চ যে আশাটি করছে, তা হলো সবচেয়ে 'কম খারাপ' পরিস্থিতি।
এর অর্থ হলো প্রণালির মধ্য দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও পণ্যের সীমিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল বজায় থাকবে, আবার মাঝে মাঝে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটবে।
এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার রিফাইনাররা সম্ভবত পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল পেতে পারে, যদিও ইউক্রেনীয় হামলার কারণে রাশিয়ার এবং যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিশোধন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের অতিরিক্ত প্রিমিয়াম অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে থাকবে।
বাজার এখন ব্রেন্ট ফিউচার দ্বারা নির্ধারিত তেলের মূল্যের দিকে কম নজর দিচ্ছে, বরং বেশি মনোযোগ দিচ্ছে হরমুজ প্রণালির ভেতরের তেলের ব্যারেলে কত বড় ছাড় (ডিসকাউন্ট) দেওয়া হচ্ছে এবং বাইরে অবাধে চলাচল করতে পারা ব্যারেলগুলোর জন্য প্রিমিয়াম কতটা বেশি নেওয়া হচ্ছে তার ওপর।
হরমুজ প্রণালির ভেতরে গিয়ে অপরিশোধিত তেল বোঝাই করার জন্য কোনো ব্যবসায়ীকে প্রলুব্ধ করা সম্ভব, তবে সেই তেলের ছাড় এত বড় হতে হবে যা দিয়ে ব্যারেলে বিমা খরচের উল্লম্ফন মেটানো যায়—যা সংঘাতের আগের প্রায় ৫ ইউএস সেন্ট থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২.৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগর থেকে উত্তর এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যারেলপ্রতি জাহাজভাড়া প্রায় ৬ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে।
তবে বিমা এবং জাহাজভাড়ার এই তীব্র বৃদ্ধির মানে হলো, ব্রেন্টে প্রতিফলিত হওয়া তেলের মূল মূল্যটি মূলত পণ্যটি হাতে পাওয়ার প্রকৃত খরচের চেয়ে অনেক কম।
অ্যাপেক সম্মেলনে তেল শিল্প যে চরম পরিস্থিতির কথা আলোচনা করতে চায়নি, তা হলো পুরো উপসাগরজুড়ে জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ।
সেই দিক থেকে তারা কিছুটা আশাবাদী ছিলেন, কারণ তারা এখনো বিশ্বাস করেন না যে এমনটি ঘটবে। তবে আবারও বলতে হয়, ছয় মাস আগেও তারা সবাই ভেবেছিলেন যুদ্ধটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
