বিরল ভাইপার সাপের লেজে গজানো 'মাকড়সার' অভ্যন্তরীণ গঠন পর্যবেক্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা
পশ্চিম ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালার শুষ্ক ও বৈরী জলবায়ুতে জীবন টিকিয়ে রাখার এক বিস্ময়কর উপায় উন্মোচিত হয়েছে।
একটি পাখি পাথরের ওপর এক দৃষ্টে কিছু একটা দেখতে পায়, যা প্রথম দর্শনে একটি মাকড়সা বলে মনে হয়। কিন্তু শিকারি পাখিটি যখনই সেটিকে ধরতে নিচে নেমে আসে, মুহূর্তেই সে নিজে শিকাড়ে পরিণত হয়। কারণ পাথর বলে মনে হওয়া বস্তুটি হঠাৎ নড়ে উঠে তাকে গিলে ফেলে।
প্রকৃতপক্ষে, খসখসে পাথরটি ছিল মাথায় শিং-সদৃশ অবয়ব থাকা একটি ভাইপার সাপের ত্বক—আর লোভনীয় ভঙ্গিমায় নড়তে থাকা 'মাকড়সাটি' ছিল কেবল তার লেজের ডগা।
১৯৬৮ সালে বিজ্ঞানীরা যখন ইরানে এই 'স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপার'-এর একটি নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন, তখন তারা মাকড়সার মতো দেখতে লেজের ডগাটিকে গুরুত্ব দেননি। শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামের নেগোনি ইন্টিগ্রেটিভ রিসার্চ সেন্টারের হার্পেটোলজি বিভাগের সহযোগী কিউরেটর এবং কোর ল্যাবরেটরির পরিচালক সারা রুয়ান বলেন, 'যে কেউ এই লেজটি দেখে মনে করবে এতে কোনো টিউমার, পরজীবী বা অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধি ঘটেছে এবং এটি সাপের শরীরের একটি অস্বাভাবিক ত্রুটি।'
তিনি আরও বলেন, '২০০৩ সালে আরেকটি সাপ সংগৃহীত হওয়ার আগে পর্যন্ত কেউ ভেবেই দেখেনি যে— এটিই হয়তো এই প্রজাতির সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্য!'
রুয়ান জানান, ১৯৬৮ সালের সেই নমুনাটি আজও ফিল্ড মিউজিয়ামের সংগ্রহে 'হলোটাইপ' হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে—অর্থাৎ এটি এমন একটি আদর্শ নমুনা, যা বিজ্ঞানীরা কোনো প্রজাতির শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০০৬ সালে গবেষকরা এই হোলোটাইপটি ব্যবহার করেই সাপটিকে 'সিউডোসেরাস্টেস ইউরারেকনয়েডেস' নামক একটি নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
এখন, রুয়ান এবং তার সহকর্মীরা এক্স-রে ইমেজিং ব্যবহার করে লেজের ডগায় থাকা কশেরুকাগুলোর ভেতরের একটি নিখুঁত চিত্র উন্মোচন করেছেন। এই গবেষণা লব্ধ ফলাফলগুলো বৃহস্পতিবার বৈজ্ঞানিক সাময়িকী 'দ্য অ্যানাটমিক্যাল রেকর্ড'-এ প্রকাশিত হয়েছে।
পোলিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের 'ইনস্টিটিউট অব সিস্টেম্যাটিক্স অ্যান্ড ইভোলিউশন অব অ্যানিম্যালস'-এর সহকারী অধ্যাপক ও প্রধান গবেষক ড. গেওরগিওস গেওরগালিস বলেন, 'স্যান্ড বোয়া বা রাবার বোয়ার মতো কিছু অন্যান্য সাপের ক্ষেত্রে লেজের ডগার কশেরুকাগুলোর গঠন অত্যন্ত অদ্ভুত এবং এলিয়েনের মতো দেখায়।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা দেখতে চেয়েছিলাম স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপারের লেজের ভেতরের গঠনও একইভাবে অদ্ভুত কি না।'
কিন্তু তার পরিবর্তে গবেষকরা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি সত্যের মুখোমুখি হলেন—যা জীবিত এবং বহু আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের কঙ্কাল নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে কেবল অস্থি বা কঙ্কাল যে সবসময় পুরো সত্য প্রকাশ করে না, তার একটি বাস্তব শিক্ষা দেয়।
সংকটে থাকা এক বিস্ময়কর সাপ
২০০৮ সালে ডক্টরেট শিক্ষার্থী থাকাকালীন, সারা রুয়ান প্রথম 'স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপার'-এর একটি অবিশ্বাস্য ভিডিও দেখেন—যেখানে সাপটি পাখি শিকারের টোপ হিসেবে তার অস্বাভাবিক লেজটি নাড়াচ্ছিল।
অন্যান্য ভাইপার সাপও তাদের লেজ নাড়ানোর জন্য পরিচিত, বিশেষ করে নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চা ভাইপারগুলোর লেজের ডগা উজ্জ্বল সবুজ বা নিয়ন হলুদ রঙের হয়, যা অসচেতন ব্যাঙের কাছে চঞ্চল কেঁচো বা পোকার মতো মনে হতে পারে। রুয়ান বলেন, 'তবে এই স্পাইডার-টেইল্ড ভাইপারের লেজের ডগার অঙ্গ ও কৌশল সম্পূর্ণ অন্য মাত্রার।'
সাপটি অত্যন্ত চতুর ও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এক প্রাণী, যা মাংসপেশির শক্তিতে খাড়া ও বিপজ্জনক পাহাড়ি খাদে বাস করে। চরম ও দুর্গম এই আবাসস্থলের কারণে বুনো পরিবেশে এই প্রাণীটিকে সংগ্রহ করা বা এটি নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন।
রুয়ান বলেন, 'আমি এই সাপের কিছু ভিডিওতে দেখেছি যে, এগুলো এত সংকীর্ণ পাথরের ফাটলে আটকে থাকে যেখানে কোনো প্রাণীই যে ভালোভাবে ঝুলে থাকতে পারবে—তা কল্পনাও করা যায় না, বিশেষ করে এমন একটি হাত-পা হীন সাপের পক্ষে। যখন এটি কোনো পাখিকে ছিনিয়ে নেয়, তখন অনেক সময় পুরো সাপটিই পাখিটির সাথে খাড়া পাহাড়ের গায়ে বাতাসে ভাসতে থাকে। এই সাপের জীবনযাত্রার পুরো শৈলীটাই বেশ রোমাঞ্চকর।'
২০২৩ সালে এক সম্মেলনে যখন রুয়ান ও গেওরগালিসের দেখা হয়, তখন গেওরগালিস ভাইপারটির 'হলোটাইপ' নমুনাটি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একজন জীবাশ্মবিদ হিসেবে, প্রাচীনকালের বিলুপ্ত সাপের খণ্ডিত জীবাশ্ম ভালোভাবে বোঝার জন্য গেওরগালিস আধুনিক সাপের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করেন।
রুয়ান বলেন, সেই সময়টি ছিল অত্যন্ত চমৎকার, কারণ ফিল্ড মিউজিয়াম তখন তাদের নতুন এক্স-রে কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি ল্যাব চালু করছিল। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নমুনার কোনো ক্ষতি না করেই স্ক্যান করে হাজার হাজার এক্স-রে ছবি তৈরি করা যায়, যা থেকে পাওয়া ৩ডি রেন্ডারিংয়ের সাহায্যে ভেতরে কী রয়েছে তা স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব—যেমন সাপের লেজের অভ্যন্তরভাগ। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনারি বায়োলজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. কার্ট শোয়েঙ্ক ( যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না) বলেন, 'সাপের কঙ্কালে শত শত কশেরুকা থাকে, যার অর্থ অতীতে সাপের মেরুদণ্ডের গঠন নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে বেশ কমই হয়েছে।'
২০২৪ সালের শেষের দিকে ল্যাবটি চালু হওয়ার পর স্ক্যান করা প্রথম নমুনাগুলোর মধ্যে এই 'হোলোটাইপ' নমুনাটি ছিল অন্যতম। গেওরগালিস জানান, স্ক্যান করার পর দেখা যায় লেজের ভেতরের কশেরুকাগুলো একদম স্বাভাবিক এবং অন্যান্য সাধারণ ভাইপারের মতোই।
তিনি বলেন, মূলত মাংসল অংশটি সুদীর্ঘ ও রূপান্তরিত আঁশ দ্বারা গঠিত, যেখানে কোনো হাড় বা অস্থি সংক্রান্ত অংশ নেই। গেওরগালিস এক ইমেইলে লেখেন, 'আজকে যদি আমাদের কাছে এর অবশিষ্টাংশ কেবল জীবাশ্ম হিসেবে থাকত, তবে এই মাকড়সার মতো লেজের রূপসংস্থান বা বাহ্যিক গঠন কল্পনা করা বা পুনর্নির্মাণ করা আমাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না। এটি একটি 'বেদনাদায়ক' স্মারক যে, বিলুপ্ত হওয়া সরীসৃপ এবং অন্যান্য হারিয়ে যাওয়া প্রাণীরা অতীতে কতটা বিস্ময়কর ও চমৎকার ছিল, জীবাশ্মের অবশিষ্টাংশ সবসময় তার সেই 'চূড়ান্ত সত্য' প্রকাশ করতে পারে না।'
একজন সরীসৃপ রূপসংস্থানবিদ হিসেবে শোয়েঙ্কও অবশ্য আশা করেননি যে, শিকারকে প্রলুব্ধ করার এই অঙ্গটিতে নরম টিস্যু বা কলার বাইরে অন্য কিছু (যেমন হাড়) থাকবে। শোয়েঙ্ক এক ইমেইলে লেখেন, 'টিকটিকি ও সাপের ক্ষেত্রে আঁশগুলো পরিবর্তিত হয়ে কাঁটা, শিং কিংবা মাংসল পিণ্ডের মতো বিভিন্ন রূপ নেওয়া বেশ সাধারণ ঘটনা। আর মাথার বাইরের অংশের ক্ষেত্রে এটি হাড় বা ভেতরের কঙ্কালের সাথে যুক্ত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।'
সাধারণত সাপের লেজের দিকের কশেরুকাগুলো ছোট আকারের হলেও, স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপারের ক্ষেত্রে লেজের কশেরুকাগুলোকে অস্বাভাবিক রকমের সূক্ষ্ম ও চিকন বলে মনে হয়েছে শোয়েঙ্কের কাছে।
শোয়েঙ্ক বলেন, 'লেজে ছোট কশেরুকা থাকার কারণে এটি বিশেষভাবে নমনীয় হয়। এটি লেজটিকে তীক্ষ্ণ ও এঁকেবেঁকে নাড়াতে সাহায্য করে, যা শিকারকে প্রলুব্ধ করার জন্য মাকড়সার মতো বাস্তবসম্মত নড়াচড়া তৈরি করতে পারে।'
এক 'চমৎকার' অভিযোজন
স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপারকে ঘিরে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে; যেমন—এর লেজের ডগায় 'কডাল লিউর' বা শিকার ভোলানোর এই আকর্ষণীয় অঙ্গটি ঠিক কীভাবে বিবর্তিত হলো। রুয়ান এই প্রজাতির নিকটতম দুটি ভাইপার প্রজাতি—'পার্শিয়ান হর্নড ভাইপার' ও 'ফিল্ডস হর্নড ভাইপার' সম্পর্কে বলেন, 'আপনি যদি স্পাইডার-টেইল্ড ভাইপারের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় দুই প্রজাতির দিকে তাকান, তবে দেখবেন তাদের লেজের গঠনও কিছুটা অদ্ভুত।'
লেজের শক্ত ও শুষ্ক বাইরের আস্তরণ সম্পর্কে রুয়ান বলেন, 'লেজটি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট এবং অত্যন্ত কেরাটিনযুক্ত বলে মনে হয়। অন্তত আমি যেসব নমুনা দেখেছি, সেগুলোর লেজের রঙ শরীরের অন্য অংশের চেয়ে আলাদা। সাপটি বালুকা-বাদামি বা ধূসর রঙের হয়ে থাকে, আর এর লেজটি হয় কুচকুচে কালো।' তিনি জানান, শিকারিকে ভয় পেঁচাতে বা শিকারকে আকর্ষণ করতে অনেক সাপই তাদের লেজ নাড়ায়। তবে র্যাটেলস্নেক-এর মতো স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপারও একটি উদাহরণ—কীভাবে নির্দিষ্ট আচরণ থেকে সময়ের পরিক্রমায় শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হয়।
রুয়ান আরও বলেন, মাকড়সার মতো এই অঙ্গটি ফুটিয়ে তুলতে কোন ধরনের জেনেটিক প্রক্রিয়া চালু বা বন্ধ হয়েছিল, ভবিষ্যতে গবেষণা সেই বিষয়টিতে আলোকপাত করতে পারে। শোয়েঙ্ক জানান, তিনি বিশ্বাস করেন এই আচরণটি সম্ভবত ভাইপারটির পূর্বপুরুষদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল।
শোয়েঙ্ক বলেন, 'স্পাইডার-টেইল্ড ভাইপার তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই আচরণটিকে গ্রহণ করে সত্যিই অসাধারণ এক রূপে পরিবর্তিত করেছে। মাকড়সার মতো দৈহিক গঠন এবং লেজের সাবলীল ও সাপের মতো এঁকেবেঁকে নড়াচড়া—এই দুটির সমন্বয়ে নড়াচড়ারত মাকড়সার এমন এক অবিকল রূপ তৈরি হয় যে, প্রথমবার যখন আমি এই আচরণের ভিডিও দেখেছিলাম, আমিও পুরোপুরি প্রতারিত হয়েছিলাম। প্রাণীর রূপ ও কার্যক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে 'প্রাকৃতিক নির্বাচন'-এর ক্ষমতার এক চমৎকার উদাহরণ এটি।'
