ট্রাম্প যতদিন ক্ষমতায় আছেন, ততদিন চলতে পারে ইরান যুদ্ধ—ধারণা ভ্যান্স ও রুবিওর
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ইরান যুদ্ধ চলতে পারে বলে মনে করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। তবে তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, তেহরান আরও কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলাতে পারবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে বেড়ে যাওয়া জ্বালানির দাম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প বুধবার সাংবাদিকদের জানান, নভেম্বরের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই যুদ্ধ শেষ হবে। তিনি বলেন, 'আমার মনে হয়, নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হবে। কারণ তারা আর বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে না।'
তবে ভ্যান্স ও রুবিও ব্যক্তিগত আলোচনায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধ ২০২৯ সালের জানুয়ারির পরও চলতে পারে। ওই সময় ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যে ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্র খাটো করে দেখেছে বলে সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরান সম্প্রতি আবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় তেহরানের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে পরে দেশটির ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্থানে এসব স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প ও ভ্যান্স দুজনই সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে যুদ্ধের প্রভাবকে কম গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ৩ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, 'আমি এটিকে যুদ্ধ বলব না।' তবে এটি কবে শেষ হবে, তা তিনি জানেন না বলেও মন্তব্য করেন।
ভ্যান্সের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, 'আমি এটিকে সামরিক সংঘাত বলি, কারণ এটি আমাদের জন্য ছোট-খাটো বিষয়। এটি বড় কোনো ব্যাপার নয়।'
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন থেকে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা যুদ্ধের প্রভাব কম করে দেখানোর প্রশাসনিক প্রচেষ্টা নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
রোববার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিনিধি মাইক ললার বলেন, 'আপনি যখনই যুদ্ধে বা সামরিক উত্তেজনার মধ্যে থাকবেন, তখন সেটিকে অবশ্যই ছোট-খাটো বিষয় বলা যায় না। এটি গুরুতর।'
বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে মার্কিন পরিবারের গড়ে কয়েক শ ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। জ্বালানি ও উড়োজাহাজের টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় বেড়েছে।
এ যুদ্ধ ট্রাম্পের 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' শিবিরের একসময়কার গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিকেও ক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মধ্যে প্রভাবশালী ভাষ্যকার টাকার কার্লসনও রয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প 'আর কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নয়' বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
যুদ্ধ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত চললে এর প্রভাব শুধু চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেই নয়, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও পড়তে পারে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে বিমান হামলা চালানোর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন ভ্যান্স। এবার রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে তিনি এগিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচক ছিলেন ভ্যান্স। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ভালো হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। তার মতে, এমন যুদ্ধ 'ব্যাপক ব্যয়বহুল' হবে।
তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন করার পাশাপাশি নিজের সমর্থকদের বিভক্ত করতে পারে—এমন একটি ইস্যু নিয়ে উদ্বেগ স্বীকার করে চলতে হচ্ছে ভ্যান্সকে।
ইরানে প্রথম দফা হামলার পর মার্চে ফক্স নিউজকে ভ্যান্স বলেছিলেন, 'ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াবেন না, যার শেষ বা স্পষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই।'
ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনাতেও যুক্ত ছিলেন ভ্যান্স। তবে এখন পর্যন্ত এসব আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হামলা চালানোর পর সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মঙ্গলবার পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ জোরদার করছে, তখন এসব হামলা চালানো হলো।
মঙ্গলবার সেন্টকম জানায়, ধ্বংস করা তেলবাহী ট্যাংকারগুলো 'বিলিয়ন ডলারের ছায়া নেটওয়ার্কের' অংশ ছিল। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলে।
এদিকে, সংঘাত অবসানের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় তেলের দাম আবারও বেড়েছে।
ট্রাম্প বুধবার বলেন, 'নির্বাচনের পরপরই তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমার মনে হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুদ্ধ শেষ হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।'
হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছেন। ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির অবশিষ্ট দুর্বল অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছেন তিনি।'
তিনি আরও বলেন, 'সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ধরনের পদক্ষেপের সুযোগ খোলা রেখেছেন। দেশে ও বিদেশে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে যাবেন এবং কোনোভাবেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না।'
মুখপাত্র বলেন, 'শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই জানেন তিনি কী করবেন এবং কখন করবেন।'
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রুবিও ও ভ্যান্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
