প্রথম ফোল্ডিং আইফোন আনল অ্যাপল, আছে তিন ডিসপ্লে; দাম কত?
টেক জায়ান্ট অ্যাপল তাদের ইতিহাসের প্রথম ফোল্ডেবল বা ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোন বাজারে এনেছে। 'আইফোন ডুও' নামের এই ডিভাইসটি বইয়ের মতো খোলা যায় এবং খোলার পর এটি একটি পাসপোর্টের সমান আকৃতি ধারণ করে।
বুধবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নতুন এই ফোনটি উন্মোচন করা হয়। ২০০৭ সালে আইফোন চালুর পর এটিই অ্যাপলের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনে আনা সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। নতুন এই ফোনের দাম শুরু হচ্ছে ১,৯৯৯ ডলার থেকে, যা গত বুধবারই ঘোষণা করা 'আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স' সিরিজের চেয়ে ৫০ শতাংশের বেশি দামি এবং একটি এন্ট্রি-লেভেল ম্যাকবুক প্রো-এর সমান।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী জন টার্নাস বলেন, 'অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এমন ফোল্ডেবল ফোন তৈরি করেছে যা দেখতে মনে হয় দুটি ফোন জোড়াতালি দিয়ে এক করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এমন একটি বড় ডিসপ্লে তৈরি করতে চেয়েছি যা আইপ্যাডের মতো স্বাভাবিক মনে হবে।'
আইফোন ডুও-র ৭.৬ ইঞ্চি ডিসপ্লেটি আকারে ক্ষুদ্রতম আইপ্যাড মিনি-র চেয়ে সামান্য ছোট। এছাড়া চলতি বছরের শেষের দিকে অ্যাপল এই ফোনে পেনসিল ব্যবহারের সুবিধা চালু করবে।
স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি ফোল্ডের মতো ফোল্ডেবল ফোন বাজারে আসার পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেলেও বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারে এগুলো এখনো মাত্র ২ শতাংশের মতো ছোট একটি অংশ দখল করে আছে। এর বড় একটা বাজার রয়েছে চীনে। অ্যাপলকে টেক্কা দিতে চলতি সপ্তাহেই হুয়াওয়ে এবং শাওমি উভয় চীনা প্রতিষ্ঠানই তাদের নতুন ফোল্ডেবল ফোন বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
আইফোন ডুও-তে মূলত তিনটি স্ক্রিন রয়েছে। ফোনটি খোলা অবস্থায় দুটি প্যানেল এবং পেছনের অংশে আরেকটি স্ক্রিন থাকে, যা ছবি তোলা বা ভিডিও কলের মতো কাজের জন্য একই সাথে ব্যবহার করা যায়। শুধু বাইরের ক্যামেরা সংলগ্ন পাশটিতে কোনো স্ক্রিন নেই।
ফোনটি ভাঁজ করা বা খোলার সাথে সাথে এর অ্যাপস এবং ডিসপ্লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানিয়ে নেয়। এটি লম্বালম্বিভাবে (ভার্টিক্যালি) না খুলে অনুভূমিকভাবে (হরিজন্টালি) খোলার উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।
অ্যাপল জানিয়েছে, ফোনটি পুরোপুরি সোজা বা ফ্ল্যাট স্ক্রিন হিসেবে খোলার সময় কবজা বা হিঞ্জের উপস্থিতি যতটা সম্ভব কমানোর জন্য তারা কাজ করেছে। প্রতিযোগীদের ফোল্ডেবল ফোনে সাধারণত ধুলোবালি ঢুকে কবজা নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো হার্ডওয়্যারজনিত সমস্যা দেখা দিত।
আইফোন ডুও-কে অ্যাপলের এ পর্যন্ত সবচেয়ে পাতলা ফোন হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। ভেতরের জায়গা বাঁচাতে ফিজিক্যাল সিম কার্ডের স্লট বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাদা ও নেভি নীল—এই দুই রঙে পাওয়া যাবে ফোনটি। এছাড়া ২৫৬ জিবি থেকে শুরু করে ২ টেরাবাইট পর্যন্ত স্টোরেজ অপশন রয়েছে এতে।
ছবি তোলার নতুন কিছু ফিচারও যুক্ত করা হয়েছে এতে। যেমন—'কিডস কিউ' ফিচারের মাধ্যমে বাইরের ডিসপ্লেতে পিনাটস কার্টুনের অ্যানিমেশন চালানো যাবে, যা ছোট শিশুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুন্দর ছবি তুলতে সাহায্য করবে। এছাড়া রয়েছে এআই-চালিত স্ন্যাপশট মোড।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বুমের কারণে মেমোরি চিপের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এবারের আইফোনগুলোর দাম গত বছরের সংস্করণের তুলনায় প্রায় ১০০ ডলার বেশি রাখা হয়েছে। বুধবারের এই উন্মোচন অনুষ্ঠানে নতুন এআই ফিচারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে সিরির একটি নতুন এআই সংস্করণ।
উচ্চমূল্যের কারণে এই ফোল্ডেবল ফোনটি সাধারণ ক্রেতাদের চেয়ে অ্যাপল ভক্তদের কাছে একটি শৌখিন বা বুটিক আইটেম হয়ে উঠতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপল চলতি বছর সর্বোচ্চ ৬০ লাখ ডুও ফোন সরবরাহ করতে পারে, যা ফোল্ডেবল বাজারের ২৫ শতাংশ হলেও ২০২৫ সালে বিক্রি হওয়া প্রায় ২৫ কোটি আইফোনের তুলনায় খুবই সামান্য। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে আইফোন ডুও-র প্রি-অর্ডার শুরু করবে অ্যাপল এবং পরের সপ্তাহ থেকেই এর ডেলিভারি শুরু হবে।
দীর্ঘদিনের সিইও টিম কুক কোম্পানির বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারপারসন হওয়ার পর গত ১ সেপ্টেম্বর জন টার্নাস আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার পর এটিই ছিল টার্নাসের প্রথম বড় কোনো বড় পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান। টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল যখন ব্যক্তিগত প্রযুক্তির ধারণাই বদলে দিয়েছিল, তখন টার্নাসের কাঁধে দায়িত্ব পড়েছে কোম্পানিটিকে ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যাওয়ার।
বুধবারের এই অনুষ্ঠানে আরও কিছু পণ্যের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে 'অ্যাপল রেফারেন্স ইমেজ', যা আইফোন ১৮ দিয়ে তোলা প্রতিটি ছবির একটি অপরিবর্তনশীল কপি তৈরি করবে। এর মাধ্যমে মূল ছবিটিতে কোনো কারসাজি বা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
ঘোষণার পর অ্যাপলের শেয়ারের দাম সামান্য কমে ০.২৮ শতাংশ নেমে দাঁড়িয়েছে ৩১৫.৩৪ ডলারে।
