১০ হাজার থেকে ৭০ হাজার: টাকা দিলেই ফেসবুকে মিলছে কিউ-১ জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ
শুরুতে বেশ আন্তরিক কথা বলে ফাঁদ তৈরি করা হয়। 'ভাই, গবেষণা পত্র লেখা থেকে শুরু করে প্রকাশনা পর্যন্ত পুরো কাজে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি।'
বিপরীত পক্ষের উত্তর, 'আমার কি কোনো পরিশ্রমই করা লাগবে না, তা-ও লেখাটি প্রকাশিত হবে? আর টাকা কখন দিতে হবে?' উত্তরে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই: 'হ্যাঁ, এটা সম্ভব। আমরাই আপনার জন্য পুরো কাজটি করে দিতে পারব।'
'বুকম্যান রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট – বিআরটিআই' নামের একটি ফেসবুক পেজের সেবা নিতে আগ্রহী এমন গ্রাহক সেজে কথা বলার সময় আমাদের কথোপকথনের একাংশ এটি। 'একাডেমিক রাইটার্স' নামের আরেকটি পেজও মূলত একই ধরনের সেবার প্রস্তাব দিয়েছিল: গ্রাহকের হয়ে পুরো পেপার লিখে দেওয়া এবং তা প্রকাশ করে দেওয়া।
যখন তাদের কাছে কিছু রিভিউ এবং কাজের নমুনা চাওয়া হলো, তারা বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করল। তবে তাদের উত্তরের বার্তাটি নীরবতার চেয়েও বেশি কিছু প্রকাশ করে দিল।
পেজটির সোশ্যাল মিডিয়া মডারেটর উত্তরে বলেন, 'আমাদের সেবাগুলো গ্রাহক এবং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমরা আমাদের গ্রাহকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সরাসরি লিংক শেয়ার করি না, কারণ এতে তাদের গবেষণা নিবন্ধটি বাতিল হয়ে যেতে পারে, এমনকি তাদের স্কলারশিপও বাতিল হতে পারে।'
তাদের এই বক্তব্য যেন নিজেরাই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নেওয়ার মতো। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তারা যা বিক্রি করছে তাতে এমন গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে যা ক্রেতাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এরপর পেজটি ১৫ মিনিটের একটি বিনামূল্যে সেশনের অফার দেয়, যেখানে তাদের কনসালটেন্ট এই পুরো কার্যপ্রণালি কীভাবে চলে এবং এর সাথে কারা কারা জড়িত তা বুঝিয়ে বলবেন বলে জানায়।
সুতরাং, আপনি যদি কোনো কিউ১ জার্নালে আপনার গবেষণা প্রকাশ করতে চান কিন্তু নিজে লেখার সময় বের করতে না পারেন, তবে এই পেজগুলোই আপনার সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারে। তাদের বিজ্ঞাপনের ভাষা বেশ সহজ ও প্রাঞ্জল—যেকোনো মার্কেটিং বার্তা ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত। আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, তবে কোনো এক অচেনা ফেসবুক পেজ থেকে ভেসে আসা এমন পোস্ট হয়তো আপনার নিউজফিডেও চোখে পড়েছে। সেই পোস্টে একটু সাড়া দিলেই স্ক্রল করতে করতে হয়তো একই ধরনের আরেকটি পেজের পোস্ট আপনার সামনে চলে আসবে।
এবার তাদের অফারটি আরও বিস্তারিত।
কোনো রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ডের মতো করে তালিকার দরদাম সাজানো হয়েছে:
কিউ১ জার্নাল – প্রথম লেখক – ৭০ হাজার টাকা
কিউ১ জার্নাল – দ্বিতীয় লেখক – ৬০ হাজার টাকা
কিউ১ জার্নাল – ষষ্ঠ লেখক – ২০ হাজার টাকা
নন-স্কোপাস জার্নাল – প্রথম লেখক – ১৫ হাজার টাকা
লেখক বা গবেষক হিসেবে নামের অবস্থান এবং জার্নালের মান ভেদে দামের তারতম্য ঘটে। তবে মূল বিষয় একই: আপনি চাইলেই এখন মাত্র ২০,০০০ টাকায় এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও কম দামে কিউ১ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে আপনার লেখকের নাম কিনে নিতে পারেন। আর এই পুরো ব্যাপারটি কোনো এনক্রিপ্টেড চ্যাট বা গোপন যোগাযোগের আড়ালে লুকিয়ে করা হচ্ছে না, যেখানে কেবল হাতে গোনা কয়েকজনই এর খোঁজ রাখে—বরং এটি এখন পুরোপুরি এক জমজমাট ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পেশাদার গবেষক এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরাও কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবসার সাথে যুক্ত রয়েছেন। গবেষণার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এমন একজন সাংবাদিকসহ সম্ভাব্য আগ্রহী যেকোনো মানুষের কাছে এই বিজ্ঞাপনটি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এ প্রক্রিয়ার শেষ কোথায় তা খোঁজার সিদ্ধান্ত নেয় 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'।
'কনসালটেন্ট'-এর সাথে কথোপকথন
'একাডেমিক রাইটার্স'-এর সাথে সেশনটি সম্পন্ন হয় হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস কলে, যার সময় নির্ধারিত হয় একদিন আগেই। ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তি নিজেকে সুপারভাইজার হিসেবে পরিচয় দেন—তবে তিনি সাবধানতার সাথে পরিষ্কার করেন, তিনি নিজে একজন বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, 'আমি মূলত এখানকার সুপারভাইজার। আমি সব প্রজেক্ট তদারকি করি। আমাদের একটি পুরো টিম আছে।' কোন ধরনের বিষয়ের ওপর কাজ করা যাবে জানতে চাইলে সুপারভাইজর বলেন, 'যেকোনো বিষয় হলেই চলবে। এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যই আমাদের একজন করে বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।'
প্রক্রিয়াটি তিনি এতটাই সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করলেন, যেন এটি তিনি বহুবার বলেছেন: কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার শব্দের একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা নিবন্ধ সম্পন্ন করা হবে। পছন্দ করার জন্য দুই বা তিনটি বিষয় দেওয়া হবে, যেগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে মূলত কত সহজে তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং জার্নালের প্রাথমিক বাছাইয়ে নিবন্ধটি গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা বেশি—তা বিবেচনা করে।
এরপর তিনি এমন একটি তথ্য দিলেন যা তাদের আগের বিজ্ঞাপনের যেটুকু বৈধতার দাবি ছিল, সেটিকেও পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। সুপারভাইজর স্বাচ্ছন্দ্যে বলেন, 'আমরা একই সাথে সাত থেকে আটটি জার্নালে নিবন্ধ জমা দিই।'
অথচ বেশিরভাগ সম্মানজনক ও নির্ভরযোগ্য জার্নালগুলোর নিয়ম হলো—নিবন্ধ জমা দেওয়ার সময় গবেষককে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মর্মে অঙ্গীকার করতে হয়, এই লেখাটি একই সাথে অন্য কোথাও পর্যালোচনার জন্য জমা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই সুপারভাইজার বিষয়টি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বলে দিলেন।
অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিটি 'বিআরটিআই'-এর মতোই একই পরিচিত ধরন মেনে চলে। অর্ধেক টাকা কাজ শুরুর আগে এবং বাকি অর্ধেক কাজ শেষ হলে দিতে হয়। কাগজ লেখার কাজ শুরু করতে ৮ হাজার টাকা। এরপর প্রকাশনা ধাপের জন্য বাকি টাকার ৫০-৫০ কিস্তি—যার চূড়ান্ত অংশটি কেবল জার্নাল থেকে নিবন্ধ গ্রহণের ইমেইল পেলেই পরিশোধ করতে হয়।
তিনি জানান, ২০১১ সাল থেকেই তিনি এই কাজের সাথে যুক্ত আছেন। এই গবেষণাগুলো সত্যিই যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি দিয়ে করানো হয় কি না জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তাদের গবেষকরা অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যায়লয়ের সাথে যুক্ত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী, এমনকি কখনো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। দাবিটি একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়, কারণ স্কোপাস জার্নালে প্রকাশের উপযুক্ত মানের গবেষণা করার মতো দক্ষতা খুব কম মানুষেরই থাকে।
তিনি জানান, সাধারণ দিনগুলোতেও তার কাছে ১০ থেকে ১২ জন সম্ভাব্য গ্রাহক আসেন।
তার এই দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে এটি নিশ্চিত করে যে এই ব্যবসাটি কেবল দু-একটি খণ্ডকালীন ফ্রিল্যান্স কাজের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা কেন এই ফাঁদে পা দেন
প্রথমে এটি ছিল ভিসার বিষয়। তারপর এলো তহবিলের প্রশ্ন। আর এখন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে শিক্ষার্থীদের আরও একটি জিনিস প্রয়োজন: কোনো নির্ভরযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং সেখানে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা। আর সেই স্কলারশিপ পাওয়ার কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায় যদি শিক্ষার্থীর নামের পাশে অন্তত একটি প্রকাশিত গবেষণাপত্র থাকে। ঠিক এই সুযোগটিতেই প্রবেশ করে তথাকথিত "একাডেমিক থিসিস রাইটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট" বা গবেষণা সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
তারা মূলত যে কাজটি করে, তার একটি নির্দিষ্ট নাম রয়েছে—'পেপার মিল'। পেপার মিল হলো এমন এক চক্র যা কৃত্রিমভাবে গবেষণা বিক্রি করে—গবেষণাপত্র, লেখকের নাম, এমনকি এই ঘটনার মতো পুরো থিসিস পেপারই তারা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। যার নাম শেষ পর্যন্ত লেখক হিসেবে প্রকাশ পায়, গবেষণায় তার কোনো ভূমিকা থাকে না।
রাশিয়া, ভারত কিংবা চীনের মতো দেশগুলোতে একই ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ড বোঝাতে এই 'পেপার মিল' শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশেরও নিজস্ব পেপার মিলের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
'প্রথম আলো'-র এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণাকাজের সাথে যুক্ত অন্তত ৩২৫টি প্রকাশিত গবেষণাপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এদের মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ৪৪টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৪২টি, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ৩২টি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২১টি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০টি গবেষণাপত্র বাতিল হয়।
এই সংখ্যাগুলোর ব্যাপ্তি এতটাই স্পষ্ট যে, এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিভাগ, একক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা র্যাঙ্কিংয়ের পেছনে ছোটা কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষকের একক সমস্যা নয়—বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপ ধারণ করেছে।
কিন্তু এমন একটি অপকর্ম কীভাবে কোনো বাধা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে ফেসবুকে প্রকাশ্যে চালু রয়েছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবদুস সালামের মতে, 'দুর্বলতা বিক্রেতাদের মধ্যে নয়, দুর্বলতা রয়েছে শ্রোতা বা গ্রাহকদের জায়গায়। বাংলাদেশে এবং সামগ্রিকভাবে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়া লিটারেসি বা সামাজিক মাধ্যমের সচেতনতা এখনো বেশ কম। মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছায় ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টেলিভিশনের মাধ্যমে—যেখানে কোনো একটি দাবি বা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য লেখক ও পাঠকের মাঝে সংবাদপত্রগুলোর মতো কোনো সম্পাদকীয় পর্ষদ থাকে না।'
একটি কিউ১ জার্নালের জন্য মানসম্মত লেখা আসলে কারা লিখতে পারে—জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'পুরো প্রক্রিয়ার কোথাও না কোথাও আসল গবেষণার অস্তিত্ব থাকতেই হয়, যা এমন কেউ সম্পাদন করেন যিনি সত্যিই গবেষণার সঠিক কৌশল জানেন।'
তবে এই পুরো প্রথার বিষয়ে তিনি বলেন, 'এটি অনৈতিক এবং বিশ্বের কোনো প্রান্তেই এটি গ্রহণযোগ্য নয়।'
