ট্রাইব্যুনালে বাবার জবানবন্দি: ‘আব্বু দোয়া করো’ বলে আন্দোলনে যান রাসেল, ফিরেন লাশ হয়ে
'আমি আন্দোলনে যাচ্ছি, আব্বু আমার জন্য দোয়া করো'—গত ১৯ জুলাই বিকেলে নারায়ণগঞ্জে কর্মরত পোশাককর্মী ছেলে রাসেল রানার কাছ থেকে ফোনে শেষ কথাটি শুনেছিলেন বাবা পিন্টু রহমান। এর কয়েক ঘণ্টা পরই সন্ধ্যায় তিনি খবর পান ছেলের বুকে গুলি লেগেছে। তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান রাসেল।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়ে এসব কথা বলেন শহীদ রাসেল রানার বাবা পিন্টু রহমান। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে পিন্টু রহমান বলেন, 'রাসেল নারায়ণগঞ্জে আমার ফুফাতো ভাই বুলবুলের সঙ্গে ইব্রাহিম কারখানায় কাজ করত। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলের দিকে আমার ছেলে ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নেয়। সে বলে—'আমি আন্দোলনে যাচ্ছি, আব্বু আমার জন্য দোয়া করো'। এ কথা বলে সে আন্দোলনে চলে যায়।'
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, 'ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ছেলের বন্ধুর ফোন থেকে আমার কাছে কল আসে। কল রিসিভ করার পর আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি রাসেলের বাবা কি না? আমি হ্যাঁ বললে তারা জানায়, রাসেল নারায়ণগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলি তার বুকে লেগেছে এবং অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা আমাদের দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলে।'
পিন্টু রহমান বলেন, 'নওগাঁ জেলায় কারফিউ চলার কারণে আমি তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকায় আসতে পারিনি। রাসেল যে ফ্যাক্টরিতে কাজ করত সেটির মালিক বুলবুল আমার আত্মীয় হওয়ায় তাকে এবং আমার চাচাতো ভাই রফিকুলকে হাসপাতালে পাঠাই। পরবর্তীতে ২২ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বুলবুল আমাকে কল করে জানায় যে রাসেল মারা গেছে। কোনো উপায় না পেয়ে আমি লাশ নওগাঁয় নিয়ে আসতে বলি। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ আনা হলে জানাজা শেষে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করি।'
জবানবন্দিতে পিন্টু রহমান বলেন, 'ছেলে মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে জানতে পারি, ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান ছাড়াও টিটু, ভিকি, সাংবাদিক রাজু, রিয়াদ, ডিস বাবুসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে চাষাঢ়া এলাকায় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করতে করতে এগোচ্ছিল। এ ঘটনার অনেক ভিডিও আছে এবং অনেকেই সরাসরি তা দেখেছে। মূলত আসামিদের গুলিতেই আমার ছেলে শহীদ হয়েছে।'
এই মামলায় প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে সাবেক এমপি শামীম ওসমান সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন এবং তিনি নিজেই সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে শামীম ওসমান এই হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯ জুলাই চাষাঢ়া ও সাইনবোর্ড এলাকায় রাসেল রানাসহ কিশোর আদিল, ইয়াসিন, শিক্ষার্থী পারভেজ এবং ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, ২১ জুলাই ফতুল্লার ভুইগড় বাসস্ট্যান্ডে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়। তৃতীয় অভিযোগটি ৫ আগস্টের, যেখানে বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
শামীম ওসমানসহ এই মামলার ১২ জন আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
