প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় প্রায় এক দশক: রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের সামনে আর কী পথ?
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো পরিকল্পিত নৃশংস সামরিক অভিযানের প্রায় এক দশক হতে চললেও সংকটের সমাধান এখনও অনিশ্চিত।
মিয়ানমার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে না বলে জানিয়েছে দেশটি।
এদিকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নও কমে আসছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও তহবিল সংকট বিবেচনায় নিয়ে চলতি বছরের মে মাসে জাতিসংঘ ও এর অংশীদাররা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
আন্তর্জাতিক সহায়তা এভাবে কমতে থাকলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর বাড়তি চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর পড়বে। জুলাই-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই চাপ আরও প্রকট হতে পারে।
বাংলাদেশ এখন একদিকে মানবিক দায়িত্ব, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ—এই দুইয়ের মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জে রয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এর আগেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনোটি কার্যকর হয়নি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর সমাধানে রূপ নেয়নি। পরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে মিয়ানমার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য ঘোষণা করলেও সেই প্রক্রিয়াও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং এর পরও নতুন করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক জটিলতা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
প্রাণভয়ে পলায়নের দীর্ঘ ইতিহাস
প্রাণের ভয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে রাজা বোদোপায়া আরাকান দখল করার পর হাজার হাজার মানুষ চট্টগ্রামে এসে আশ্রয় নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও রোহিঙ্গাদের বড় ধরনের স্থানচ্যুতি ঘটে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার এবং মুজাহিদ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। এরপর ১৯৭৮ সালে 'অপারেশন নাগামিন'-এর শিকার হয়ে দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ১৯৯১-৯২ সালেও নতুন করে আড়াই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
তবে সবচেয়ে বড় স্থানচ্যুতি ঘটে ২০১৭ সালে যখন আরসা-র (ARSA) হামলার পর। সে সময় মিয়ানমারের সেনাদের নৃশংস অভিযানে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যার সূত্র ধরেই আজ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী এদেশে বসবাস করছে।
বাংলাদেশের ওপর বহুমাত্রিক চাপ
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন বাংলাদেশে অবস্থান দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো তুলনামূলক দরিদ্র এলাকায় এর প্রভাব আরও স্পষ্ট। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে মূল্যস্ফীতি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।
২০২০ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, কক্সবাজার অঞ্চলে ৮ হাজার ১ দশমিক ২ একরের বেশি বনভূমি উজাড় হয়েছে। এর পাশাপাশি মাটিক্ষয়, ভূমিধস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং স্যানিটেশন সংকটও তীব্র হয়েছে। হাতি-মানুষের সংঘাত বেড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জীববৈচিত্র্য। বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ সামলাতে স্থানীয় অবকাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে হিমশিম খাচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পগুলোতে খুন, গোলাগুলি, অপহরণ, মাদক পাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা বেড়েছে। ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রেও ক্যাম্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি উগ্রপন্থা ও চরমপন্থা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত আরও জটিল হওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা ও অস্বস্তিও বাড়ছে।
এদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার ব্যর্থ হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং মানবিক সংকট—দুই ধরনের বাস্তবতাই জড়িয়ে আছে।
প্রথমত, আরাকান অঞ্চলে চীন ও ভারতের বড় ধরনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও কালাদান প্রকল্প তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মধ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
তৃতীয়ত, মিয়ানমারের সমাজ ও রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের মুসলিমবিরোধী মনোভাব এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি ও অধিকার ফিরে পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
চতুর্থত, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মাদক পাচারের অভিযোগ ও সামাজিক কলঙ্কও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও বৈষম্যমূলক আচরণকে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্যতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রত্যাবাসন বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন কিংবা এর ১৯৬৭ সালের প্রটোকলের স্বাক্ষরকারী নয়। এ কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সাধারণত 'ফোর্সিবলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনালস' বা এফডিএমএন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
তবে ১৯৫১ সালের কনভেনশনে শরণার্থী সংকটের যে তিনটি স্থায়ী সমাধানের কথা বলা হয়েছে—স্থানীয়ভাবে একীভূতকরণ, স্বেচ্ছায় নিজ দেশে প্রত্যাবাসন এবং তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন—এর বাইরে বাস্তবসম্মত ও মানবিক সমাধানের পরিসর খুবই সীমিত।
বাংলাদেশ একাধিকবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের স্থানীয়ভাবে একীভূত করা কোনো বিকল্প নয়; স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই একমাত্র কার্যকর সমাধান।
১৯৭৮ এবং ১৯৯১-৯২ সালেও রোহিঙ্গাদের স্থানীয়ভাবে একীভূত করার প্রস্তাব উঠেছিল। তখনও বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের পথেই এগিয়েছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে স্থানীয় সমাজে একীভূত করার বাস্তবসম্মত সুযোগ বাংলাদেশের নেই। এমন কোনো উদ্যোগ দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যার ভারসাম্য, স্থানীয় অবকাঠামো ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘাত স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করলেও দেশটি স্পষ্ট জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করবে না।
এদিকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত Forced Migration Review-এর ৫৪তম সংখ্যার আলোচনায় উঠে এসেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানীয়ভাবে একীভূতকরণ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে প্রত্যাবাসন কঠিন হওয়ায় তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে বড় পরিসরে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হলে তা আরও মানুষকে দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করতে পারে—এমন 'পুল ফ্যাক্টর' তৈরির আশঙ্কায় এ ধরনের উদ্যোগও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই। তবে সংকট প্রায় এক দশকে পা দেওয়ার পর এটাও উপলব্ধি করা জরুরি যে, শুধু প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং তার অপেক্ষায় বসে থাকা যথেষ্ট নয়।
তাই প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশকে বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে এবং দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। তা না হলে সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থ ও মানবিক দায়িত্ব—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগোতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তি এবং মিয়ানমারের দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া এই সংকটের কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান একা বাংলাদেশের পক্ষেও সম্ভব নয়।
- লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
- যোগাযোগ: 20212053725nur@juniv.edu
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের একান্ত নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
