তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ: পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা কার্নির; কানাডার গাড়ি, ট্রাকে ৫০% শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র হচ্ছে। কানাডা পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়ার পর এবার দেশটি থেকে আসা গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কানাডা থেকে আসা গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর এ ঘোষণা দিলেন তিনি।
শেষ মুহূর্তে অযৌক্তিক নতুন দাবি তোলার জন্য দুই দেশই একে অপরকে দোষারোপ করছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ট্রাম্পের নতুন শুল্কের হুমকিকে 'অপ্রত্যাশিত নয়' বলে মন্তব্য করেছেন। ট্রাম্প কানাডার গাড়িশিল্প ধ্বংস করতে চান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'সঠিক মনোভাব' নিয়ে আলোচনায় এলে কানাডা আবারও আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা এখন স্থগিত রয়েছে। কবে আবার আলোচনা শুরু হবে, তারও কোনো তারিখ ঠিক হয়নি।
গত শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসে কানাডা। ওই সময়সীমার পর কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা ছিল।
সপ্তাহের শুরুতে অবশ্য পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন দুই পক্ষই নতুন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আশাবাদী ছিল। দুই দেশের মধ্যে শিগগিরই একটি নতুন বাণিজ্যচুক্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
কানাডার কর্মকর্তারা বলেছেন, আলোচনার শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু নতুন দাবি তোলে, যা 'গ্রহণযোগ্য নয়'। এর মধ্যে কানাডা কোন কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে, তা সীমিত করার একটি শর্তও ছিল।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, শেষ মুহূর্তে কানাডাই নতুন পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল।
সোমবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, 'তারা আরও বেশি চেয়েছিল।'
আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
সোমবার কানাডার গাড়িশিল্পে নতুন শুল্কের হুমকি দেন ট্রাম্প। এর আগে কার্নি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডার পণ্যে যত ডলারের শুল্ক আরোপ করবে, কানাডাও মার্কিন পণ্যে সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক বসাবে।
কার্নি জানিয়েছেন, শুক্রবারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নতুন ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত কানাডার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করাই এখন তার প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে কানাডার বাণিজ্য আরও বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে কুইবেকের একটি জাহাজ কারখানায় কানাডীয় কোস্ট গার্ডের জন্য ছয়টি আইসব্রেকার নির্মাণে ১১ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার (৭.৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছেন কার্নি। পুরোনো মাঝারি ও ভারী আইসব্রেকারগুলোর জায়গায় এগুলো ব্যবহার করা হবে।
শীতকালে কানাডার উত্তরাঞ্চল ও আটলান্টিকের জলপথে জাহাজ চলাচলের পথ খুলতে এসব আইসব্রেকার ব্যবহার করা হবে।
এদিকে কানাডার গাড়িশিল্পের প্রধান কেন্দ্র অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড কড়া ও অশালীন ভাষায় ট্রাম্পকে জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, কানাডার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য বাড়তি দাম নেওয়া।
কীভাবে পাল্টা জবাব দেওয়া যায়, তা নিয়ে মার্ক কার্নির সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
ফোর্ডের মন্তব্যের জবাবে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তাকে 'বড় বড় কথা বলা' ব্যক্তি বলে কটাক্ষ করেন। তিনি লেখেন, 'এই ভাঁড়গুলোকে কেউ বলুক লাইনে আসতে, না হলে কানাডার জন্য পরিণতি আরও অনেক খারাপ হবে।'
কানাডার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৬০ শতাংশ আসে কানাডা থেকে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিরও প্রায় ১০০ শতাংশের অংশীদার।
দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক এবং আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কানাডার পাল্টা শুল্ক উভয় দেশের ব্যবসায় ক্ষতি করতে পারে।
এই দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে উত্তর আমেরিকার আরেক দেশ মেক্সিকোর ওপরও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে থাকা ইউএসএমসিএ বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কানাডা ও মেক্সিকো চুক্তিটির মেয়াদ আরও ১৬ বছর বাড়াতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বর্তমান অবস্থায় চুক্তিটি নবায়ন করা হবে না। এই চুক্তির আওতায় উত্তর আমেরিকায় ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, বাড়তে থাকা বাণিজ্য উত্তেজনায় ইউএসএমসিএ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। এমন হলে কানাডা মন্দায় পড়তে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
