এখনো পলাতক ৬৯০ বন্দি, কারা কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য নেই ১৬৬ জনের: আইজি প্রিজন্স
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬৬ জনের কোনো তথ্য নেই কারা কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া কারাগার থেকে পালানো ৯ জঙ্গির মধ্যে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও হদিস নেই ৩ জনের।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পুরান ঢাকার বকশিবাজারে অবস্থিত কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
৫ আগস্ট কারাগার থেকে কতজন বন্দি এবং জঙ্গি পালিয়ে গেছেন এবং কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জানতে চাইলে আইজি প্রিজন বলেন, 'প্রায় ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে গিয়েছিলেন। এই মুহূর্তে আমাদের হিসাবে প্রায় ৬৯০ জন বন্দি এখনো পলাতক। এর মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য আমরা এখনো পাইনি। এই ১৬৬ জন নরসিংদীর কারগার থেকে পালিয়েছিল। সেখানে সব নথিপত্র এবং সার্ভার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাদের বিষয়ে জানতে আদালতের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। নরসিংদীর ওই কারগার থেকে মোট ৮২৬ জন পালিয়েছিল।'
পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে তিনি বলেন, কারাগার থেকে মোট ৯ জন তালিকাভুক্ত জঙ্গি পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে ৬ জনকে পুরনায় আটক করা হয়েছে। এদের একজন জুয়েল 'ওস্তাদ' জামিনে বের হয়েছিলেন। সম্প্রতি তাকে পুলিশ আবার গ্রেপ্তার করেছে। তবে এখনো তিনজন জঙ্গি পলাতক রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানী ও এর আশপাশে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়ার সঙ্গে পলাতক জঙ্গিদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোর সঙ্গে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের কোনো ধরনের সংযোগ আছে কি না, সেটা নিয়ে আমরাও কিছুটা চিন্তিত। তাদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি।'
সম্প্রতি গ্রেপ্তার জুয়েল 'ওস্তাদের' সঙ্গে পলাতক 'বোমারু মামুনের' কারাগারে যোগাযোগ হয়েছিল। এসব জঙ্গিদের কারাগারে একসঙ্গে রাখার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, 'আসলে এটি আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আপনারা জানেন, আমাদের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় দুই হাজারের অধিক বন্দির জন্য হলেও বাস্তবে সেখানে অনেক বেশি বন্দি অবস্থান করছেন। ফলে আবাসন আমাদের একটি বড় সমস্যা।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে কারাগারের যে অবস্থা, তাতে কাউকে একেবারে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। হয়তো সে একই ওয়ার্ডে অথবা একই বিল্ডিংয়ে থাকার কারণে কোনো না কোনোভাবে অন্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে হয়তো আমাদের ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা ছিল, যে কারণে তারা নির্বিঘ্নে মেশার সুযোগ পেয়েছে এবং হয়তো সেই সুযোগ তারা কাজে লাগিয়েছে। তবে বর্তমানে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এ ধরনের সিরিয়াস বা ঝুঁকিপূর্ণ বন্দি থাকলে তাদের পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখে আলাদা জোনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি কারাগারেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, তারা যাতে অন্য বন্দিদের সংস্পর্শে আসতে না পারে।'
আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা কারাগারে থেকেই কারা রক্ষীদের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন—এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে না—এ কথা আমি ১০০ শতাংশ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারছি না। তবে একইসঙ্গে আমরা কোনোভাবেই এ বিষয়ে ছাড় দিচ্ছি না। গত এক বছরে আমরা বিভিন্ন অভিযানে তিন হাজারের অধিক মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছি। শুরুর দিকে সংখ্যাটি অনেক বেশি ছিল। ধীরে ধীরে এখন বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের ঘটনা কমে এসেছে। আমি একটি বিষয় বলতে পারি—আমার কাছে যদি কোনো তথ্য আসে বা কোনোভাবে বিষয়টি শনাক্ত করা গেলে আমরা তা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি মনে করি, এ প্রবণতা অনেক কমে এসেছে।'
বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে এ প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, 'আমাদের চিকিৎসক সংকট রয়েছে। আমাদের মোট ১৫১টি চিকিৎসক পদ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক পোস্টেড আছেন। অন্যান্য কারাগারে আমরা অস্থায়ীভাবে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে চিকিৎসক পাচ্ছি। তারা অন্য জায়গায় কর্মরত থাকেন। ফলে তারা কারাগারে ফুলটাইম সময় দিতে পারেন না। এ কারণে সমস্যা হয়।'
সম্প্রতি পুলিশের বিশেষ অভিযানে অনেকে গ্রেপ্তার হচ্ছে; এতে কারগারে বন্দি ব্যবস্থাপনা কীভাবে হচ্ছে, জানতে চাইলে মোতাহের হোসেন বলেন, 'আমরা গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বন্দি নিয়ে কাজ করি। কিন্তু সম্প্রতি এই সংখ্যা বেড়েছে। আজকে আমাদের প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি আছে। গতকালের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দি আসছেন এবং প্রায় ৩ হাজার জন বেরিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনই এভাবে বন্দির আসা-যাওয়া চলছে। দুই লাখের কাছাকাছি যে সংখ্যা নিয়ে বলা হচ্ছে, তার বড় অংশই আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে যে ব্যালেন্সটা থেকে যাচ্ছে, সেটাই আমাদের মোট বন্দির সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।'
তিনি আরো বলেন, '১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২৬ হাজারের অধিক মোবাইল কোর্টে দণ্ডিত আসামি আমরা পেয়েছি। আমাদের দৃষ্টিতে বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অনেককে অল্প সময়ের জন্য সাজা দেওয়া হচ্ছে—কারও একদিন, কারও পাঁচ দিন, কারও সাত দিন, আবার কারও এক মাস বা তিন মাস। এভাবে বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কারাগারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে সরকারের নজরে এনেছি। আশা করছি, সরকার এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেবে।'
বর্তমানে কারাগারে কতজন বিদেশি বন্দি আছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'বর্তমানে আমাদের কারাগারে মোট ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন।এর মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়ে গেছে এবং তারা নিজ নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাদের বিভিন্ন দূতাবাস ও সরকারের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।'
বিদেশি বন্দি মারা গেলে তাদের মরদেহ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, জানতে চাইলে মোতাহের হোসেন বলেন, 'গত দুই বছরে আমরা প্রায় ১৭ জন বিদেশি বন্দির মরদেহ ব্যবস্থাপনা করেছি। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে ফেরত পাঠাতে পেরেছি। বাকিগুলো আমরা এখানে সংরক্ষণ করেছি। আমাদের একটি নীতিমালা রয়েছে—সাধারণত তিন মাস পর মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমরা আশা করছি, সরকার সিদ্ধান্ত দিলে তাদের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু তাদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে আসছে না, তাই নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।'
আইজি প্রিজন আরো জানান, দেশের কারাগারগুলোতে মোট ৪৫ হাজার বন্দি ধারণ ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছেন।
