এলসি গ্যারান্টির আন্তঃব্যাংক আইনি বিরোধে আটকে আছে প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা
বিপুল খেলাপি ঋণ আর চাহিদার চরম মন্দায় জর্জরিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে—তা হলো ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আইনি লড়াই। ইনল্যান্ড বিল পারচেজ (আইবিপি) সুবিধা এবং ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) গ্যারান্টি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যকার বিরোধের কারণে সারাদেশের অর্থ ঋণ আদালতে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আটকে রয়েছে, যা আন্তঃব্যাংক আস্থার ক্ষয়েরই ইঙ্গিত দেয়।
এমনই একটি ২৩ বছর পুরোনো বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল উত্তরা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের মধ্যে। ২০০২ সালে চট্টগ্রাম টোব্যাকো কোম্পানির ইস্যু করা ৫৭টি পোস্ট-ডেটেড বা অগ্রিম তারিখের চেককে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূচনা হয়।
প্রাইম গ্লোবাল লিমিটেড (পিজিএল) নামে চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠান এসব চেক উত্তরা ব্যাংকের কাছে উপস্থাপন করে আইবিপি সুবিধা গ্রহণ করে। চেকগুলো সোনালী ব্যাংকের হিসাবের ওপর ইস্যুকৃত ছিল এবং প্রতিটি চেকে সোনালী ব্যাংক "গুড ফর পেমেন্ট" অনুমোদন দেয়, এবং পরবর্তীতে লিখিত পুনঃনিশ্চিতকরণ (রিকনফার্মেশন) প্রদান করে।
এই নিশ্চয়তার ওপর আস্থা রেখে উত্তরা ব্যাংক পিজিএলকে প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার আইবিপি সুবিধা দেয়। কিন্তু ২০০২ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে চেকগুলো উপস্থাপন করা হলে ৫৭টির চেকের সবকটি ডিজঅনার হয়। এর ফলে উত্তরা ব্যাংক দাবি করে যে, সোনালী ব্যাংকের নিশ্চয়তার কারণেই তারা অর্থায়ন করেছিল এবং চেকের অর্থ পরিশোধে সোনালী ব্যাংক দায় এড়াতে পারে না। অন্যদিকে, পিজিএলের দাবি ছিল, চেকগুলোর অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা একমাত্র সোনালী ব্যাংকই দিয়েছিল, ফলে দায়ও সোনালী ব্যাংকের। এই বিরোধ থেকেই উত্তরা ব্যাংক ২০০৩ সালে প্রায় ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আদায়ের জন্য ২০০৩ সালে ঢাকার অর্থঋণ আদালতে মামলা করে।
এ মামলায় সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডিক্রি হয় ২০০৬ সালে। সোনালী ব্যাংক ওই ডিক্রি চ্যালেঞ্জ করে ২০০৭ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আবেদনটি খারিজ হয়। ব্যাংকটি তখন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে। আপিল বিভাগ গত বছরের আগস্ট মাসে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন।
তবে অর্থঋণ আদালত এখনো সেই ডিক্রি বাস্তবায়ন করতে না পারায় উত্তরা ব্যাংক তাদের পাওনা অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খানের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ (রুমী) আলী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে সালিশি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। আর উন্নত দেশের আদালতগুলোতে মামলা প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি অনুসরনের বাধ্যবাধকতা থাকে। বাংলাদেশ সেটি অনুসরণ করতে পারে।
এছাড়াও কোনো ব্যাংকের কারণে এরকম বিরোধ তৈরি হলে ওই ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে ব্যবস্থা নিতে পারে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার বলে মনে করেন অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার।
আইনি লড়াইয়ে আটকে ১২,০০০ কোটি টাকা
সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন অর্থঋণ আদালত থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সারা দেশে এই ধরনের ৭,৩৫৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার সঙ্গে প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা যুক্ত। এর মধ্যে ঢাকার ৪টি অর্থঋণ আদালতেই ৩,৬৩৪টি মামলা ঝুলে আছে, যেখানে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬,৫০০ কোটি টাকা।
অর্থঋণ আদালতগুলোতে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের দায়ের করা মামলা হয়েছে এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ৫৭৮টি, যার সাথে জড়িত প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ৭১৫টি, যার সাথে জড়িত প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা; ২০২৩ সালে ১,১২৩টি মামলা হয়েছে, যার সাথে জড়িত প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা এবং ২০২২ সালে ১,২২৩টি, যার সাথে জড়িত প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা।
এদিকে মামলা বাড়লেও, নিষ্পত্তির হার একবারেই কম।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে এধরনের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৭২টি, যার সাথে জড়িত প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৬টি মামলা, যার সাথে জড়িত প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
একটি ব্যাংক কখন অপর ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে
আইবিপি সুবিধা হলো ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত একটি বাণিজ্যিক ঋণ সুবিধা। এর মাধ্যমে দেশের ভেতরে স্থানীয় এলসি বা বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে, ব্যক্তি বা সরবরাহকারীকে পণ্য সরবরাহের পরপরই বিলের বা ডকুমেন্টের বিপরীতে নগদ অর্থ বা আগাম অর্থ প্রদান করা হয়।
ব্যাংকিং ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া টিবিএসকে জানান, অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩ এর ২(গ)(২) ধারায় আইবিপি, গ্যারান্টি, ক্ষতিপূরণ বা ইনডেমনিটি, এলসি এবং অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সৃষ্ট দায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এলসি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই এলসি করতে গেলে একটি ব্যাংককে অন্য ব্যাংকের জন্য জামিনদার বা গ্যারান্টার হতে হয়। দেশীয় বাণিজ্যে ব্যাংকগুলো সাধারণত আইবিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে।
"এসব পদ্ধতি লোকাল বাংকের মধ্যে হতে পারে বা লোকাল ব্যাংকের সাথে বিদেশি কোনো ব্যাংকও জড়িত হতে পারে। গ্যারান্টার ব্যাংক নেগোশিয়েটিং ব্যাংককে পেমেন্ট না করলে, সেই টাকা আদায়ে নেগোশিয়েটিং ব্যাংক মামলা করে।"
এ ছাড়া ইনডেমনিটি বা ক্ষতিপূরণের লিখিত নিশ্চয়তার ভিত্তিতেও ব্যাংক মামলা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ব্যাংক কোনো গ্রাহককে অর্থ প্রদান বা এলসি বিল নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা দিয়ে লিখিত ইনডেমনিটি বা অঙ্গীকারনামা দিতে পারে।
ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, "গ্রাহক অর্থ গ্রহণ করার পরও যদি তা সময়মতো পরিশোধ না করে, তখন যে ব্যাংক অর্থ প্রদান করেছিল তারা ইনডেমনিটি প্রদানকারী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ে মামলা দায়ের করতে পারে।"
আন্তঃব্যাংক বিরোধের প্রথম মামলা
ভেলভেট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড নামের একটি টেক্সটাইল কোম্পানি তুলা উৎপাদনকারী স্কয়ার ইয়ার্নের কাছ থেকে তুলা কেনার জন্য ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে সিটি ব্যাংকের মতিঝিল প্রিন্সিপাল অফিসের মাধ্যমে একটি এলসি খোলে। এলসির মূল্য ছিল প্রায় ৪০,০০০ ডলার। স্কয়ার ইয়ার্ন কোম্পানির ব্যাংক ছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতিঝিলের প্রধান শাখা। এক্ষেত্রে সিটি ব্যাংক ছিল এলসি ইস্যুয়িং ব্যাংক, আর মার্কেন্টাইল ছিল নেগোশিয়েটিং ব্যাংক।
স্কয়ার ইয়ার্ন গ্রাহকের কাছে তুলা চালান করার পর—মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাধ্যমে চালানের সব নথিপত্র সিটি ব্যাংকের কাছে প্রেরণ করে, সিটি ব্যাংক তা গ্রহণ করে এবং সেগুলো সঠিক হিসেবে আমলে নেয়। সিটি ব্যাংক মাকের্ন্টাইল ব্যাংককে জানায় যে, বিলটি উপযুক্ত হলে ১২০ দিনের মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংককে পেমেন্ট করা হবে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে, মার্কেন্টাইল ব্যাংক বিক্রেতার ৪০ হাজার ডলার পরিশোধও করে। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সিটি ব্যাংক মার্কেন্টাইল ব্যাংককে ওই অর্থ ফেরত দেয়নি।
পাওনা অর্থ আদায়ে ২০০৪ সালে ঢাকার অর্থঋণ আদালত-১ এ সিটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। মামলাটিতে ২০০৬ সালে সুদ-আসলে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা আদায়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনূকুলে ডিক্রি দেন আদালত। পরবর্তীতে সিটি ব্যাংক সেই টাকা পরিশোধ করে।
এই মামলায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পক্ষের একজন আইনজীবী টিবিএসকে বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ প্রণয়নের পর দেশের ইতিহাসে ওই আইনে এটিই ছিল ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের প্রথম মামলা।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের তৎকালীন প্রধান শাখা ব্যবস্থাপক এম এ শাহজাহান জানান, "সে সময় দেশীয় এলসির মূল্যমানও মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করা হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক মাত্র ৬ মাস আগে দেশীয় বাণিজ্যিক লেনদেনে টাকার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে।"
নিষ্পত্তিতে ধীরগতি
২০১৩ সালে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে যমুনা ব্যাংক। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য একজন ব্যবসায়ীর খোলা ৪টি এলসির বিপরীতে জামিনদার বা গ্যারান্টর হয়েছিল যমুনা ব্যাংক। মামলাটিতে যমুনা ব্যাংকের প্রায় ৮ কোটি টাকা পাওনা দাবি রয়েছে। আদালতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে ঢাকার অর্থঋণ আদালত-১-এ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কারওয়ান বাজার শাখার বিরুদ্ধে মামলা করে প্রিমিয়ার ব্যাংক গুলশান শাখা। এই মামলায় ৯ কোটি টাকার দাবি রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের। আদালত সুত্রে জানা যায়, একজন গ্রাহকের এলসির মাধ্যমে লেনদেনের জন্য কৃষি ব্যাংক গ্যারান্টর ছিল। কিন্তু সময়মতো টাকা পরিশোধ না করায় এই মামলা হয়েছে। এই মামলাটিও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য 'আর্বিট্রেশন অ্যাক্ট' বা সালিশি আইন রয়েছে।
তিনি বলেন, কখনো কখনো এলসি নিয়ে এ ধরনের বিরোধ তৈরি হয়। তবে মামলাগুলো যে কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধেই দায়ের করা হয়, বিষয়টিকে সেভাবে দেখা ঠিক নয়। মূল লেনদেনের সঙ্গে জড়িত মূল পক্ষকেও মামলায় বিবাদী করা হয়।
"আদালত যখন চূড়ান্ত বিচারে কোনো ব্যাংককে দায়ী মনে করেন, তখন সেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডিক্রি জারি করা হয়। এ ধরনের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় গাইডলাইন জারি করেছে, তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পূর্ণভাবে বিচার বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়" –যোগ করেন তিনি।
