ঘৃণার চাষাবাদ
আপনি কাউকে কেন ভালোবাসেন? বা আপনি কাউকে কেন ঘৃণা করেন? দুটো প্রশ্নের উত্তরের পেছনেই থাকে এক বা একাধিক কারণ। বন্ধুত্ব বা শত্রুতা তৈরি হওয়ার পেছনেও কিছু কারণ তো থাকবেই, সেটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা।
তবে, বহু স্বাভাবিকত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে অস্বাভাবিকত্বকেই স্বাভাবিক করে তুলেছে প্রযুক্তি; ইংরেজিতে যাকে বলে 'ডিসরাপশন'। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এর বড় উদাহরণ। একজন মানুষ যতজন মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারতো বা সংযুক্ত থাকতে পারতো, সেই স্বাভাবিকতায় আমূল পরিবর্তন এনেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। সবকিছুকেই বহুগুণ করে তুলেছে প্রযুক্তি। সময়, কাল, স্থান, ভাষা, দেশ, সীমারেখা—সবকিছুকে ভেঙেচুরে নতুন এক ভার্চ্যুয়াল পৃথিবী তৈরি হয়েছে।
মানুষের নির্মিত এই ভার্চ্যুয়াল পৃথিবীতে ঘৃণা আর ভালোবাসার পেছনের কারণগুলো ভেঙেচুরে নতুন নিয়ম তৈরি করেছে সামাজিক মাধ্যমগুলো। ভালোবাসার, মানবিকতার, সফলতার নানা গল্প এই মাধ্যমগুলোতে জমা হলেও ঘৃণার চাষাবাদের দৌরাত্ম্যই যেন বেশি।
দেশ, ধর্ম, দল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা, অনুসারী—এমন হাজারো গুরুত্বপূর্ণ বা তুচ্ছ বিষয়কে পুঁজি করে ঘৃণার বীজ বপন হয় প্রতি মুহূর্তে। 'কুসংবাদ বাতাসের আগে ধায়'—প্রবচনকে সত্যি প্রমাণ করে সেই ঘৃণা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে; এক থেকে দ্বিগুণ, দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ হয়ে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক, বর্তমান প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী, খাদ্যরসিক, সিনেমা প্রেমী, গাছের বন্ধু, ভ্রমণপ্রেমী, প্রাণী প্রেমী, পড়ুয়া—এমন অসংখ্য 'ইন্টারেস্ট'-এর ভিত্তিতে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামে ছোট-বড় নানা গ্রুপে যুক্ত এখন প্রায় সবাই। এমনকি পরিবার-আত্মীয়স্বজন নিয়ে আছে নানা গ্রুপ। যোগাযোগকে সহজ করা বা সংযুক্ত থাকার শক্তিকে সুসংহত করার সুযোগ থাকলেও এসব গ্রুপেও ঘৃণার ছড়াছড়ি চলতেই থাকে।
মুখোমুখি দেখা হলে যে সম্পর্কটা সহজ, স্বাভাবিক, স্বাচ্ছন্দ্যময় থাকে; প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে তা হয়ে ওঠে ভিন্নতর। এখানে সহজেই একজন আরেকজনকে আক্রমণ করতে ন্যূনতম দ্বিধাবোধ করেন না। মানুষে মানুষে নয়, বরং প্রযুক্তি-মানুষের সাথে প্রযুক্তি-মানুষের চলতে থাকে বাদানুবাদ। যেখানে ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের টুটি টিপে ঘৃণা নিজের দৌরাত্ম্য বজায় রাখে।
সব মানুষকে সবাই পছন্দ করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে যার সাথে কোনো সংযোগ নেই, যে বিষয়ের কোনো সংযোগ নেই, সেখানেও ঘৃণা ছড়াতে ইতস্তত বোধ করেন না অনেকেই। কোনো কারণ ছাড়াই তীব্রতর ঘৃণায় বিষিয়ে তোলেন পরিবেশ।
আর এইসব ঘৃণাকে পুঁজি করেই আরেক পক্ষ আখের গোছায়। যত বেশি শেয়ার-লাইক-কমেন্ট, তত বেশি আয়ের সুযোগ। গুটিকয়েক মানুষ তাদের সেই ভার্চ্যুয়াল আয়ের পথকে সচল রাখতে ও বাড়িয়ে তুলতে নিজ দায়িত্বেই ঘৃণার বীজে পানি দেন, সার দেন, যত্ন করে ঘৃণাকে বাড়িয়ে চারপাশে ছড়িয়ে দেন। সাধারণের চোখের সামনে চোখধাঁধানো ছবি, ভিডিও, গ্রাফিক্স আর নানা কথা দিয়ে প্রভাবিত করে চলেন এই নব্য ডিজিটাল পীরের দল। কেন ঘৃণা করছি, সেই মৌলিক প্রশ্নের জবাব না খুঁজে কোনো কারণ ছাড়াই ঘৃণার ফুলঝুরি চলতে থাকে অবাধে।
একটা সময় ছিল যখন মানুষ অন্যের ক্ষতি করতো নিজের লাভের জন্য। এখন নিজের লাভ থাক বা না থাক, অন্যের ক্ষতি করাই যেন মূল মন্ত্র। নিজ গুণে, নিজ কর্মে খ্যাতি পেয়েছেন এমন কেউ হয়তো তার একটা ছবি শেয়ার করেছেন। ওই ছবির নিচের মন্তব্যগুলো পড়ে যে পরিমাণ ঘৃণার দেখা মেলে, ভালোবাসা সে তুলনায় নগণ্য। অথচ যিনি ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, তিনি একাজ করে কী লাভবান হচ্ছেন? ঘৃণা ছড়িয়ে আদৌ কিছু যোগ হচ্ছে তাঁর পাওয়ার তালিকায়?
একজন বিখ্যাত মানুষের সাথে যদি কারো পরিচয় থাকে আর ওই বিখ্যাত মানুষকে নিয়ে যদি একটা নেতিবাচক পোস্ট বা তথ্য শেয়ার করা যায়, তাহলে অখ্যাত কেউও অনেক লাইক-শেয়ার-কমেন্ট পেতে থাকেন। বিখ্যাত মানুষের নিন্দা করে নিজের অ্যাকাউন্টে কিছু লাইক-কমেন্ট-শেয়ার যুক্ত করার প্রতিযোগিতার উদাহরণ ভূরি ভূরি।
একটা দল আবার আরও এককাঠি সরেস। আপনি কী চিন্তা করবেন, কী বলবেন—তা যেন তারাই নির্ধারণ করে দেবে। 'এই ইস্যুতে কেন কথা বললেন না' বা 'ওই ইস্যুতে কেন চুপ থাকলেন'—সব যেন তাদের মাথাব্যথা। আর তাদের মতো করে না বললেই চলবে ঘৃণার তির, চরিত্রহননের মহোৎসব।
অথচ যাকে যার পছন্দ নয়, তিনি কিন্তু চাইলেই তাঁর ওয়ালে আসা থেকে বা তাকে ফলো করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। তবে প্রযুক্তিকে পুঁজি করে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধানোর মতো সমস্ত শক্তি নিয়ে নিজের ভেতরের দানবকে তুলে ধরে ঘৃণা-বৃক্ষকে মহীরুহ করে তুলতে বিশেষ পারদর্শিতায় পৌঁছে যাচ্ছেন অনেকেই।
ভোগবাদীতার চূড়ান্ত এখন সর্বত্র। সবকিছুকে বিকিয়ে দেওয়ার এই যুগে ভোগবাদীতার উৎসাহিত করার অবারিত সুযোগ আছে। কেনাবেচা চাঙ্গা রাখতে সেই সুযোগের ব্যবহার চলে সমানতালে। এই চক্করে মাঝখান দিয়ে মানুষের না-পাওয়ার তালিকা লম্বা হয়ে ওঠে। না-পাওয়া থেকে তৈরি হয় ক্ষোভ আর সেখান থেকেই ঘৃণা ছড়ানোর এই চূড়ান্ত মহোৎসব। যা ইচ্ছে বলার, যা ইচ্ছে লেখার যে স্বাধীনতা প্রযুক্তির কারণে তৈরি হয়েছে, তাকে ভালোবাসায় না বদলে ঘৃণায় বদলানোর চর্চায় যিনি ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, যাদের জন্য ছড়াচ্ছেন—সবার মানসপটেই যুক্ত হচ্ছে অস্থিরতা। ঘৃণার বিষে মনুষ্যত্ব নেমে যাচ্ছে তলানিতে।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অথবা সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেই ঘৃণার জগতে বিচরণ শুরু হয় বেশিরভাগ মানুষের। বিষাক্ত বাতাস থেকে যেভাবে মানুষ নিশ্বাসে বিষ নেয়, তেমনি করে ঘৃণা ছড়িয়ে থাকা চারপাশ থেকেও বিষ নেয়। যে বিষ জমা হয় মনে, মননে, সম্পর্কে, মানবিকতায়, বেঁচে থাকায়।
নিজের ভেতরের কালিমা কোথাও ঢেলে দেওয়ার আগে একটিবার কি ভেবে দেখা যায়—কেন ঘৃণা করি, ঘৃণা ছড়িয়ে কী পাচ্ছি?
মহাদেব সাহার কয়েকটি লাইন ঘৃণা ছড়ানো চারপাশের উদ্দেশ্যে—
'যারা চাও আমাদের মাঝখানে বয়ে যাক শুধু হিমঝড়-
তোমাদের সকলের ঘৃণার বদলে আর উপেক্ষার বিনিময়ে আমি
হে মানুষ, ব্যথিত-ব্যাকুল এই ভালোবাসা আর দুই চোখভরা
এই আলুথালু অশ্রুজল ছাড়া কিছুই আনিনি;
হে মানুষ, দুর্পিত মানুষ, তোমাদের কুৎসা আর ঘৃণার বদলে
আমি সহিষ্ণু বৃক্ষের মতো দেখো বুক চিরে এখনো ফোটাই ফুল,
আজো আরক্তিম ভালোবাসা তোমাদেরই সমর্পণ করি
তোমাদের ঘৃণার উত্তরে বলি প্রিয়, হাত জোড় করে চাই ক্ষমা।'
