পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন নৌবাহিনীকে তাড়াতে হরমুজকে সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের সামরিক উপস্থিতি সীমিত করার লক্ষ্যকে সামনে এনেছে ইরান। এর অংশ হিসেবে প্রণালীটি দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার অঙ্গীকার করেছে তেহরান।
তেহরানের এই হুমকি বার্তা দিচ্ছে যে, ইরানি নেতৃত্বের ওপর ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী জেনারেলদের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটি থেকে মার্কিন বাহিনীকে খেদানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। এই অবস্থায়, বিপুল সামরিক-বেসামরিক ক্ষতির মুখোমুখি হলেও– গত প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানের আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে পারস্য উপসাগরে আমেরিকার একক আধিপত্য গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটি বড় সুযোগ দেখছেন ইরানি নেতারা।
হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত দেশ ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরানের সঙ্গে চলমান আলোচনার মধ্যেই প্রকাশ্যে এই হুমকি দিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা। অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের কোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা শুল্ক আরোপ তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই তীব্র বিরোধই চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, মার্কিন নৌবাহিনী যদি প্রণালিটি দিয়ে চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের পারস্য উপসাগরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের নেই বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা। উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যে গত এপ্রিলেই পেন্টাগন হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল।
তবে এ ধরনের কঠোর বা সর্বোচ্চ মাত্রার দাবি উত্থাপন করে ইরান মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোভাব পরীক্ষা করছে—তিনি কি যুদ্ধ নতুন করে শুরু করতে চান, নাকি আপাতত কোনো আপস কিংবা বিকল্প পথ খুঁজছেন; সেটাই বুঝতে চাইছে তেহরান।
ট্রাম্পের পদক্ষেপ যাই হোক না কেন, "এর চূড়ান্ত ফল হবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যত (ডি ফ্যাক্টো) নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা," বলেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক ও সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালির জন্য কেবল এমন একটি ব্যবস্থাপনাই গ্রহণ করবে, যেখানে ইরান কোনো প্রকার টোল বা ফি আদায় করতে পারবে না এবং কারো যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত যেকোনো বিশেষ পথ কেবল সাময়িক হবে। অপর এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান কোনো বাধা ছাড়া প্রণালিটি উন্মুক্ত দিলে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর থেকেও মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, মার্কিন অবরোধের কারণে "এটি (হরমুজ) এখন একরকম খোলাই রয়েছে।" তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরান "যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে বা সমুদ্রে মাইন পেতে রাখতে পারে। আর পানির নিচে একটা মাইন থাকা মানেই পুরো (জাহাজ চলাচল) ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা—কারণ কেউ নিজের শতকোটি ডলারের জাহাজ মাইনের আঘাতে উড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইবে না।"
গত জুনে ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারক সই করেছিলেন, তার লক্ষ্যও ছিল হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং যুদ্ধ অবসানে আরও বিস্তারিত আলোচনার পথ সুগম করা। তবে হরমুজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জাহির করতে গিয়ে ইরানি বাহিনী জাহাজে হামলা চালানোয় সেই সমঝোতা ভেস্তে যায় বলে দাবি মার্কিনীদের।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত খসড়া চুক্তিতে সাময়িকভাবে ইরানের উপকূলের পাশ দিয়ে পারস্য উপসাগরে জাহাজ প্রবেশের এবং ওমানের উপকূলের কাছে বের হওয়ার আলাদা লেন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে; তবে এতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন।
এই চুক্তি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ পুনরায় চালু করতে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে পারস্য উপসাগরীয় আরব জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো—যারা তাদের অর্থনীতি ধ্বংসকারী এই যুদ্ধে চরম ক্লান্ত—আশঙ্কা করছে যে এটি তাদের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত প্রণালীটিতে ইরানকে স্থায়ী কর্তৃত্ব এনে দেবে।
এদিকে বিপ্লবী গার্ডের চাপের মুখে থাকা ইরানি কূটনীতিকদের দাবি, প্রণালীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে হলে ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের মতো আরও পদক্ষেপ নিতে হবে।
আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বার্তাসংস্থা- ফার্স নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইসরায়েলি জাহাজ চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে; পাশাপাশি এই অঞ্চলে ইরানের মিত্র মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত যেকোনো জাহাজ বা পণ্য পরিবহনেও একই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ফার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব দেশ ইরানের ক্ষতি সাধন করেছে, তাদের চলাচলের অনুমতি পাওয়ার আগে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এছাড়া ইরানের সরকার ও সামরিক বাহিনী এই নেভিগেশন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে। বর্তমানে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের পর্যালোচনায় থাকা আইনের খসড়ায় এই শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ'-এর ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ জানান, যুদ্ধজাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞাই তেহরানের মূল দাবি। ওয়ায়েজ বলেন, "ইরানের এই নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রুভাবাপন্ন যেকোনো জলযানকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখা।"
মধ্যস্থতাকারীরা অবশ্য জানিয়েছেন, বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে, ইরান-ওমান চুক্তির প্রস্তাবে সেগুলোর উল্লেখ নেই। তবে ইরানি কর্মকর্তারা যখন আরব মধ্যস্থতাকারীদের কাছে এই দাবিগুলো সরাসরি তুলে ধরেন, তখন তারা এগুলোকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করেন, যা পরবর্তীতে আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। এটি মূলত প্রণালিটিতে যেকোনো জাহাজের অবাধ যাতায়াত বন্ধে রেভোল্যুশনারি গার্ডের অনড় মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
