সহিংস দাম্পত্য সম্পর্ক: একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, এ ধারণা ভুল
শুধুমাত্র 'সংসার টিকিয়ে রাখার' জন্য সম্পর্কে থেকে যাওয়া নারী-পুরুষ দুজনের জন্যই আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। এরকম অসংখ্য ঘটনা আমরা দেখছি, খবরে পড়ছি। এই সম্পর্কগুলোতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা নাই বা ভালো সম্পর্কও নাই, কিন্তু আছে অবিশ্বাস, ঘৃণা, অশ্রদ্ধা ও ঝগড়াঝাঁটি। এরপরও কোনোভাবে সংসারকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন।
দেখা যায়, এই গ্রুপের যারা, তারা সম্পূর্ণ নিরানন্দ একটি জীবন কাটিয়ে যান, অথবা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন। অনেকে এই বিষাক্ত সম্পর্কের মধ্যেই থেকে যান। যেকোনো কারণেই হোক, যারা থেকে যান, তারা ক্রমশ বিষণ্ন ও হতাশ হয়ে পড়েন, আত্মহত্যা করেন অথবা সঙ্গীর হাতে নিহত হন। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন এবং স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন হওয়ার ঘটনা সবসময় ঘটছে। অথচ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের উচিত নিজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অনেকেই, বিশেষ করে নারী, বিভিন্ন কারণে নিজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন না। কিছুদিন আগে ঢাকার দক্ষিণখানে নিজ বাসায় নিহত হন নারী দন্তচিকিৎসক সারাহ রোকসানা পিনু। প্রথমদিকে ডাকাতি বা লুটপাট বলে মনে হলেও পরে অভিযোগ ওঠে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে নিহতের স্বামী জড়িত। স্বামী সোহেল রানা এখন পুলিশি হেফাজতে। এই দম্পতির দুটি ছোট বাচ্চা রয়েছে। পিনুর ভয় ছিল যেকোনো সময় তার স্বামী তাকে মেরে ফেলতে পারে। এমন কথা নিহতের বোন বলেছেন।
যদি মৃত্যুর আশংকাই ছিল, যদি বোঝা যাচ্ছিল এই সম্পর্কে ঝুঁকি আছে, তাহলে কেন একজন ডাক্তার হওয়ার পরেও পিনু সংসার থেকে বের হয়ে এলেন না? নিরাপদে সরে আসার সুযোগ কি ছিল না? তাহলে তো আজ তার দুই সন্তানকে অকালে মাতৃহারা হতে হতো না। যে সংসার ও সন্তানের জন্য উনি মুখ বুজে সব সহ্য করে নিয়েছিলেন, সেই সংসার ও সন্তান ছেড়ে তাকে চলে যেতে হলো।
পিনুর পরিবারের দাবি, তারা শুরু থেকেই সোহেলকে সন্দেহ করেছিলেন। পিনু প্রায়ই ফোন করে বলতেন, স্বামীর পরকীয়া, নিয়ন্ত্রণকামী আচরণ এবং নানা মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি খুব অসহায় বোধ করতেন। পিনুকে চাকরি করতেও বাধা দেওয়া হতো। স্বামীর আচরণে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন।
পিনু বা পিনুর মতো অসংখ্য নারী এই ধরনের সম্পর্ক থেকে যে বের হতে পারেন না, এর অন্যতম কারণ ট্রমা বন্ড বা আতঙ্কজনক সম্পর্ক। এটা এমন একটি মানসিক বন্ধন যেখানে ভয়, নির্যাতন এবং কিছু ভালোবাসা ও স্নেহ একসঙ্গে মিশে যায়। এ কারণেই বাইরে থেকে সম্পর্কটি ক্ষতিকর মনে হলেও, ভুক্তভোগীর জন্য তা ছেড়ে বেরিয়ে আসা অনেক খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এটি সাধারণত প্রেম, বিয়ে, বা অন্য যেকোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
নিপীড়ণকারী ব্যক্তি ভালোবাসে, আদর করে, ঝগড়ার পর খুব ভালো ব্যবহার করে এবং শেষপর্যন্ত ক্ষমাও চায়। পরে আবার অপমান করে, হুমকি দেয়, এমনকি মারধর ও মানসিক নির্যাতন করে। কিছুদিন পর পর একই আচরণ ফিরে ফিরে আসে।
এই ওঠানামার কারণে ভুক্তভোগীর মস্তিষ্কে ও মনে 'হঠাৎ বা অনিশ্চিত পুরস্কার' পাওয়ার একটি আশা তৈরি হয়। সে আশা করতে থাকে, এবার হয়তো সত্যিই নির্যাতনকারী মানুষটি বদলে যাবে। তার এই আশাই সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
'অনিয়মিত বা হঠাৎ পুরস্কার পাওয়া'র ব্যাপারটা হচ্ছে আচরণবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মানুষের মস্তিষ্ক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভালো কিছুর অপেক্ষায় থাকে। এই কারণেই অনেক ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকেও মানুষ বের হতে পারে না। ভালো ফলাফলটা ঠিক কখন আসবে তা অনিশ্চিত থাকায় মানুষ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে।
এটা পড়াশোনা, খেলা, ভালো কাজের ক্ষেত্রে হলে ক্ষতিকর নয়। যখন এটি নিয়ন্ত্রণ, প্রতারণা বা নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা মানুষের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ক্ষতিকর সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্ষতিকর সম্পর্কে থাকার কারণেই হয়তো নতুন বছরের (২০২৬) প্রথম ছয় মাসে ২৩৭ জন নারী গৃহ সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৯১ জনকে স্বামী হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আছে। নিগৃহীত হয়ে ৬৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন (সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র)।
বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার জীবনসঙ্গী বা স্বামী কর্তৃক সহিংসতার শিকার হয়েছেনÑযার মধ্যে রয়েছে শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।
২০২৪ সালে শতকরা ৪৯ জন নারী এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। চিন্তার কথা হলো তিনজন ভুক্তভোগীর মধ্যে, দুজন ভুক্তভোগী অর্থাৎ শতকরা ৬২ জন, কখনোই বলেননি যে তারা সহিংসতার মুখোমুখি হন বা হয়েছেন। উদ্বেগজনক এই তথ্যটি উঠে এসেছে 'নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪' এ (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল)।
বাংলাদেশে স্ত্রী নির্যাতন কতটা হচ্ছে, এটা বোঝার জন্য উপরের জরিপটি একমাত্র নয়। বিশ্বের যেসব দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার বেশি, সেসব দেশের তালিকায় ৪র্থ স্থানে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের নাম সেই ২০২১ সালে (সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)। দেশের অধিকাংশ পুরুষ মনেকরে স্ত্রীকে নির্যাতন করে তারা কোনো অন্যায় করেনি এবং এজন্য তারা লজ্জিতও নয়।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে, এতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ডা: পিনু আছেন, এটা জেনেও কেন তার পরিবার এগিয়ে আসে নাই? কেন ওনার পাশে দাঁড়ায়নি? কেন এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসার পরামর্শ দেয়নি?
বাংলাদেশে পরিস্থিতি এমনটাই। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে সবাই পরামর্শ দেয় স্বামী ও শ্বশুরবাড়িতে যেভাবে হোক মানিয়ে নিতে। তবে সব পরিবার একরকম নয়। অনেক পরিবার মেয়েকে সহায়তা করে।
তবে অধিকাংশ পরিবার বিভিন্ন কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। অধিকাংশ পরিবারেরই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকে। বিশেষ করে মেয়েকে ও তার সন্তানদের দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আর মধ্যবিত্ত ও কিছু উচ্চবিত্ত পরিবার নিজেদের সম্মানের কথা ভাবে। মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে বা স্বামীর দ্বারা নিযাতিত হয়ে ফিরে এসেছে, সংসার করতে পারেনি, এটা পরিবারের জন্য লজ্জার। অনেক স্বচ্ছল পরিবারও সমস্যার গুরুত্বকে ছোট করে দেখে।
দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভয় বা অনিশ্চয়তা কাজ করে। পরিবার ভাবে, মানিয়ে নিলে সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছুই ঠিক হয় না। নিজ পরিবার সাপোর্ট দেয় না বলে অনেক মেয়েই মুখ বন্ধ করে স্বামীর গৃহেই রয়ে যান।
আরেকটি শ্রেণি আছে, যারা বের হয়ে এসে নিজে আয় করতে পারেন, তারাও বের হন না, যেমন ডা: পিনু। দীর্ঘদিন অপমান, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। কেউ কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তারা অন্য কোথাও গ্রহণযোগ্য হবেন না।
সমাজে এখনও বিয়ে বিচ্ছেদকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে, নির্যাতন আরও বাড়তে পারেÑএমন আশঙ্কা অনেকের মধ্যে থাকে। বাস্তবেও দেখা গেছে, বিচ্ছেদের চেষ্টা অনেক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটি হতে পারে।
অনেক নারী আর্থিকভাবে স্বামীর উপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ মা মনেকরেন বাবা-মা আলাদা হলে সন্তানের ক্ষতি হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সহিংস পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিবিএস এবং ইউএনএফপিএ এর জরিপেই বলা হয়েছে এতভাবে নিপীড়ণের শিকার হওয়ার পরেও নারী আইনের দ্বারস্থ হন না বা চিকিৎসা সুবিধা নেন না। কারণ এইসব সহায়তার জন্য নারীকে অর্থ ব্যয় করতে হয়, নারীর হাতে সে পরিমাণ অর্থ নাই। আর সামাজিক রীতিনীতি অনেক নারীকে নীরব থাকতে বাধ্য করে।
স্বামীর কাছে মারধরের শিকার হয়ে সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মেয়েরা স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চান। নানাধরনের আইনি পরামর্শ নেয়ার পরও শেষপর্যন্ত তারা কোনোটাই গ্রহণ করেন না। বরং কেউ সন্তান নেন, কেউ নির্যাতনমূলক পরিবেশেই থেকে যান। এই পরিস্থিতি নারীর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। সমাজ কী বলবে এই শংকা থেকে অধিকাংশ নারী তালাক দেন না বা মামলা করেন না।
গ্রামের নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত নারীর অবস্থা আরও করুণ। এদের অধিকাংশই মনে করেন স্বামী ভাত দেয়, তাই মারতে পারে। নারীর অবস্থান স্বামীর নীচে, কাজেই মার খাওয়াটা জায়েজ। গ্রাম বা শহর, ধনী-মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারে নির্যাতনমূলক দাম্পত্য সম্পর্কের শেষ পরিণতি হয় খুব খারাপ।
দাম্পত্য সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা চললে, তা প্রতিবেশী বা পরিবারের সদস্যরা সাধারণত জেনে যান। কিন্তু কেউ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন না। কারণ তারা মনেকরেন পারিবারিক সহিংসতা স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়, কাজেই হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। কিন্তু পারিবারিক সহিংসতা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়।
আতঙ্কজনক সম্পর্কের মধ্যে নারী, পুরুষ এবং অন্যান্য লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষও থাকতে পারেন। তবে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার ক্ষেত্রে নারী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এরকম নির্যাতনমূলক পরিস্থিতির মধ্যে যারা থাকেন, তারা যদি একান্তই সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে তাদের প্রয়োজন বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সাপোর্ট। ভালো মুহূর্তের পাশাপাশি সঙ্গীর ক্ষতিকর আচরণগুলিও বিবেচনা করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া।
সর্বোপরি 'একদিন ঠিক হয়ে যাবে', এটা না ভেবে যদি সম্পর্কে সহিংসতা বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে, তাহলে সাহস করে নিরাপদে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করতে হবে।
- শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
