বর্ষা: ছিন্নপত্রের হৃদয়পত্রের
অনেক সময় যুদ্ধ জমানো সহজ, কিন্তু গল্প জমানো সহজ নয়।
—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আষাঢ় এসেছে, তবু কোনো মেঘ ছিল না সেই সন্ধ্যায়। তবে চাঁদ উঠেছিল, মৃদু হাওয়ার মধ্যে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল ছোট্ট নদীর মধ্যে দিয়ে দাঁড় ফেলবার শব্দ। এই ছোট নদী গিয়ে মিলেছে যমুনার সঙ্গে। মাঝিরা তাই যমুনা পাওয়ার আগেই নিরাপদ স্থানে পাল গুটিয়ে কাঁছি বাঁধে। তবে এই নিরাপদ স্থান তো ভালো লাগবার কথা নয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
নিরাপদ স্থান মানেই আরও কত নৌকা বাঁধা আছে আশপাশে, জঙ্গলের গন্ধ ভেসে আসছে–নাকে লাগছে; নিরাপদ মানেই এখানে একটুও হাওয়া নেই, এইখানে ভারি ঝুপসি। অতএব তিনি বললেন, নৌকাকে ছোট নদীর ওইপারে নিয়ে যেতে। যদিও সেখানে উঁচু পাড় নেই আর সমতলের ধানখেতেও এসে গেছে এক হাঁটু জল। কিন্তু রাজাজ্ঞায় মাঝিদের সেখানেই নৌকা নোঙর করতে হলো। আর কী আশ্চর্য ঘটনা–ঠিক তখনই ঝড় ধেয়ে এল রাজার হাওয়া খাওয়ার সাধ মেটাবে বলে।
মাঝিরা 'আল্লা, আল্লা' করছে, কখনো বলছে 'আল্লা মালেক'; রবীন্দ্রনাথ অবলীলায় এত সুন্দর করে সেসব লিখেছেন যে পড়তে পড়তে মনেই হয় না, মুসলমানদের জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচয় ছিল না বলে তাদের গল্প-উপন্যাসের চরিত্র করতে খুবই দ্বিধা ছিল তাঁর। ঝড়বৃষ্টির এমন দিনেই রবীন্দ্রনাথের মনে জেগেছিল এই গভীর গূঢ় তাৎপর্যপূর্ণ কথাটি, 'জীবনটা একটা গম্ভীর বিদ্রুপ, এর মজাটা বোঝা একটু শক্ত–কারণ, যাকে নিয়ে মজা করা হয়, মজার রসটা সে তেমন গ্রহণ করতে পারে না।' কথাটি প্রায়ই আওড়াতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আর মামুন হুসাইনের স্মৃতিতর্পণ থেকে সে কথা জানতে জানতে আমাদের অনেকেরই ধারণা জন্মেছে, ইলিয়াসই বোধ করি এই কথা বলেছেন; এভাবে কত কথারই যে মালিকানার বদল ঘটে, কে তার হিসাব রাখে।
কিন্তু ইন্দিরা দেবীর কাছে শাহজাদপুর (সাজাদপুর) থেকে লেখা ওই চিঠিতে নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ছিন্নপত্রাবলী'তে বর্ষাকে প্রথম তরঙ্গিত হতে দেখি, আমাদের 'ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া' দেখা চৌহালী নামের জনপদে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য লিখেছেন চুহালি; হতে পারে তখন ও রকমই লেখা হতো। এখনো জল থই থই করে এই চৌহালীর চতুর্দিকে। ইন্দিরাকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন চুহালী বা চৌহালীর যমুনায় পালতোলা নৌকায় বসে। চিঠি তো নয়, তিনি যেন তাঁর সেই 'বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর' কবিতাটিই লিখেছিলেন নতুন করে। যা একদিন ছিল তাঁর মনের কল্পনা, তাই যেন সত্যি হয়েছিল জলপথে চৌহালী থেকে যেতে যেতে। কী এক অসম্ভবের প্রত্যাশায় তিনি তখন হয়ে উঠেছেন ছোট সেই রাজপুত্র–যে কি না পাড়ি দিচ্ছে একটি ছোট নদী, আর তখনো তার সামনে আরও বারো নদী, আরও সাতটি সমুদ্র।
পরের দিনও চিঠি লিখেছেন তিনি। লিখেছেন, মাত্র মিনিট ১৫ বাইরে বসতে না বসতেই কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে আকাশজুড়ে, আর ঝড়বৃষ্টির দাপট থেকে রেহাই পেতে শুধু তার নৌকাই নয়–আরও কয়েকটি নৌকা যমুনা ছেড়ে ছোট এক নদীতে প্রবেশ করেছিল। তাড়াহুড়া করে দড়িদড়া নোঙর দিয়ে মাটি আঁকড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিল। গরু আর বাছুরগুলো লেজ তুলে যেভাবে দৌড়াচ্ছিল, তা থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, ঝড় আসছে। সাপুড়েদের বাঁশির শব্দতোলা সেই ঝড়ে নদীর জলের ঢেউগুলো যেন নাচছিল তিন লক্ষ সাপের মতো তীব্র ফণা তুলে।
নিজেই তো কত দিন দেখেছি, বর্ষার জ্যোৎস্না কী অপরূপ! নৌকা বাইতে জুড়ি ছিল না আমার বন্ধুদের–শহীদের, মোস্তফার, হাকিমের। কখনো সোনদাও বিলে, কখনো বা দুবলাই বিলের মধ্যে নৌকা নিয়ে গিয়ে কত রাত আমরা হাল-বৈঠা তুলে নৌকার পাটাতনে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে তাকিয়ে থেকেছি ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতেও বোবা মায়া নিয়ে তাকিয়ে থাকা চাঁদ-জ্যোৎস্নার দিকে। শহীদ মরে গেছে, মরে গেছে মোস্তফাও, কিন্তু ওদের আয়ু নিয়েই যেন-বা আমি এখনো বেঁচে আছি, পৃথিবীকে এই স্মৃতিরাতের কথা জানিয়ে যাব বলে। বর্ষার এই জ্যোৎস্না নিয়ে যা আমি বলতে চাই, অথচ বলতে পারি না, তাই যেন বলে গেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ছিন্নপত্রাবলী'র পাতায়।
পড়ি, পড়ি আর বারবার পড়তে ইচ্ছে করে এইসব কথা, অপার জ্যোৎস্না উঠেছে সাজাদপুর নাকি এই পৃথিবীজুড়ে, আর সেই জ্যোৎস্নায় কেবলমাত্র একটি নিস্তব্ধ রাত্রি এসেছে কবিকে সঙ্গ দিতে। আর তখন 'একলা বসে বসে আমি যে এর ভিতরে কী অনন্ত শান্তি এবং সৌন্দর্য দেখতে পাই সে আর ব্যক্ত করতে পারি নে।
এক দল আছে তারা ছট্ফট্ করে "জগতের সকল কথা জানতে পারছি নে কেন", আর এক দল ছট্ফটিয়ে মরে "মনের সকল ভাব প্রকাশ করতে পারছি নে কেন"–মাঝের থেকে জগতের কথা জগতেই থেকে যায় এবং অন্তরের কথা অন্তরেই থাকে।... মাথাটা জানলার উপর রেখে দিই–বাতাস প্রকৃতির স্নেহহস্তের মতো আস্তে আস্তে আমার চুলের মধ্যে আঙুল বুলিয়ে দেয়, জল ছল্ ছল্ শব্দ করে বয়ে যায়, জ্যোৎস্না ঝিক্ ঝিক্ করতে থাকে এবং অনেক সময় 'জলে নয়ন আপনি ভেসে যায়।"'
এমনই কোনো বর্ষার সন্ধ্যায় টেবিলের কাছে কেদারা টেনে বসে রবীন্দ্রনাথ যখন অপেক্ষা করছিলেন কবি কালিদাসের, তখন তাঁর কাছে এসে হাজির হয়েছিলেন সেই পোস্টমাস্টার, যাকে নিয়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত গল্পটি লিখেছিলেন 'হিতবাদী' পত্রিকাতে; আর সেই গল্পের প্রসঙ্গ তুলে এই পোস্টমাস্টার 'বিস্তর হাস্য বিস্তার করেছিলেন।'
এক বর্ষায় তিনি দেখেছিলেন বালিকা এক 'জনপদবধূ'কে, যাকে জোর করে টেনে তুলে দেয়া হচ্ছিল নৌকায়, পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিল তার শ্বশুরবাড়িতে; যা দেখতে দেখতে সেদিনের সেই সকালবেলা হয়ে উঠেছিল তার কাছে করুণ এক রাগিনী, মনে হয়েছিল সুন্দর এক পৃথিবী এটি–অথচ বেদনাময়। মনে হয়েছিল তাঁর, বিদায়কালে এইভাবে নৌকায় করে নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ার মধ্যে মিশে থাকে যেন আরও গভীর এক করুণা।
লিখেছেন তিনি, 'অনেকটা যেন মৃত্যুর মতো–তীর থেকে প্রবাহে ভেসে যাওয়া–যারা দাঁড়িয়ে থাকে তারা আবার চোখ মুছে ফিরে যায়, যে ভেসে গেল সে অদৃশ্য হয়ে গেল। জানি, এই গভীর বেদনাটুকু, যারা রইল এবং যে গেল উভয়েই ভুলে যাবে, হয়তো এতক্ষণে অনেকটা লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বেদনাটুকু ক্ষণিক এবং বিস্মৃতিই চিরস্থায়ী। কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে–এই বেদনাটুকুই বাস্তবিক সত্যি, বিস্মৃতি সত্যি নয়। এক-একটা বিচ্ছেদ এবং এক-একটা মৃত্যুর সময় মানুষ সহসা জানতে পারে এই ব্যথাটা কী ভয়ংকর সত্যি। জানতে পারে যে, মানুষ কেবল ভ্রমক্রমেই নিশ্চিন্ত থাকে, আশঙ্কা এবং শোকই জগতের ভিতরকার সত্য। কেউ থাকে না, কিছুই থাকে না, সেটা এমনি সত্য যে স্মরণও থাকে না, শোকও থাকে না–এবং সেইটে মনে করলে মানুষ আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে যে, কেবল যে থাকব না তা নয়, কারও মনে থাকব না।''
বর্ষা আসে আর বর্ষা আসে বলেই রবীন্দ্রনাথ নিজের মনের দুয়ার খুলে জানাতে পারেন হৃদয়ের মধ্যে নীরবতাকে খুঁজে পাওয়ার কথা। বলতে পারেন, সেদিন তিনি সারা দিন নদীর কল্লোল শুনেছিলেন; শুনতে পেরেছিলেন, কেননা সেদিন তার সঙ্গে কেউ ছিল না, সেদিন তারও কাউকে কিছু বলার ছিল না। লিখেছেন তিনি ইন্দিরা দেবীর কাছে, 'একটিমাত্র মানুষ কেবলমাত্র সামনে উপস্থিত থাকলেই প্রকৃতির অর্ধেক কথা কানে আসে না।' ভাবতে ভাবতে বুঝি 'একটিমাত্র মানুষ' মানে কেবল সামনেরজনই নয়, নিজেও বটে, মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্বকেও বিস্মৃত হতে হয় নীরবতাকে পেতে হলে; কেননা নিজের মনে যত কথা জাগে, ঘোরাফেরা করে, সেই কথার ভিড়েই মানুষের মন উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে সবচেয়ে বেশি করে।
অথচ কোনো সৃজনযজ্ঞে সম্পৃক্ত হতে চাইলে সবচেয়ে আগে যা দরকার, তা হলো নিজেকেই নীরব রাখা। কী উজ্জ্বল এই সত্য–মাত্র একজন মানুষের নিকট উপস্থিতিতেই প্রকৃতি আধাআধি বোবা হয়ে যায়, অর্ধেক কথা হাওয়া হয়ে যায়। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত রবীন্দ্রনাথের একা-একা কেটেছে বোটে। তাই তিনি বলতে পেরেছেন, দিনের পর দিন যদি কথা না বলে ইন্দিরার দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা থাকত, তাহলে সে বুঝতে পারত চারপাশকে নিবিড় করে গ্রহণ করার আর উপভোগ করার ক্ষমতা তখন বেড়ে যায় আশ্চর্যজনক ভীষণভাবে; তখন অনুভব করা যায়, আমাদের আশপাশ চারপাশও কত কথা কয়ে চলেছে; শুধু নিজেকে স্তব্ধ করেই মানুষের পক্ষে সম্ভব অমনভাবে প্রাণ-প্রকৃতি আকুল করে বুঝতে পারা।
কেউ ছিল না, তাই সেদিন শ্রাবণের বাষ্পাচ্ছন্ন প্রান্তরে থাকা রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল শাশ্বত নীরবতা, যে নীরবতার মধ্যে তিনি শুনতে পেয়েছিলন প্রকৃতির অন্তহীন বিচিত্র ভাষা আর নদীর কলধ্বনির প্রতিটি মোচড়, তার হৃদয় তখন হয়ে উঠেছিল নীরব গোপনতার উর্বর এক ভূমি। নীরবতার মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের দুটো জীবন–যার একটি থাকে মনুষ্যলোকে, আরেকটি থাকে ভাবলোকে।
পদ্মার ওপরের আকাশে তিনি লিখেছিলেন তার নিজের ভাবলোকের জীবনসম্পদের অজস্র পৃষ্ঠা। যখনই পদ্মায় ভাসতেন, পূর্ব বাংলায় আসতেন, একা একা নীরবতার মুখোমুখি হতেন, তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠত আকাশজুড়ে লেখা সেই ভাবলোক।
এই বর্ষাকাল, এই নীরবতা-অরবতা তাঁকে মুখোমুখি করেছিল আরও এক নির্মম সত্যের; আর তা হলো, তিনি তখন বুঝতে পারতেন, তাঁর কবিতায় তিনি কিছুই লিখতে পারেননি। প্রকাশ করতে পারেননি হৃদয়ের অনুভবকে। প্রকৃতির সঙ্গে তার যে একান্ত মানসিক ঘরকন্না, সেখান থেকে উঠে এসেছিল এই অনুভব, '...ভাষা তো কেবল আমার একলার নয়–ভাষা সাধারণের ব্যবহারের জন্যে, আমি আমার সমস্ত প্রকৃতি দিয়ে যা অনুভব করি সাধারণে তা করে না এবং সাধারণে ভাষাও সে সম্বন্ধে কোনো কথা স্পষ্ট করে বলতে চায় না।'
'ছিন্ন পত্রাবলী'তে পাই, আমাদের এই পূর্ব বাংলার, আমাদের এই কুষ্টিয়া-পাবনা-সিরাজগঞ্জের পাঁচটি বর্ষাকাল। পরপর যে পাঁচটি বর্ষাকাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাটিয়েছেন শিলাইদহে, শাহজাদপুরে, পতিসরে, কখনো বা গোয়ালন্দের নৌপথে, কখনো আবার পাবনার নৌপথে। শুধু আকাশে মেঘ জমেনি, মেঘ জমেছে কবির মনে; শুধু প্রকৃতিতে বৃষ্টি ঝরেনি, বৃষ্টি ঝরেছে কবির মনে; শুধু নদীতে বান ডাকেনি, বান ডেকেছে কবির মনেও। কবি কালিদাস যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসকে সবিশেষ করে তুলেছিলেন, চিঠিতে চিঠিতে নতুন করে বাঙ্ময় করে তুলেছেন তিনি সেই আষাঢ়কে। বিহ্বল, মুগ্ধ হৃদয়ে ভেবেছেন সেই কালিদাসের দিন, মেঘদূতের দিনকে যা কিনা হয়ে উঠেছে বর্ষার চিরকালীন প্রথম দিনÑসেই দিন এসে ধরা দিয়েছে তার নিজের কাছেও। কণ্ঠে তাঁর এই গান জেগে উঠেছে, 'আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে...'।
এই গান তিনি লিখেছিলেন পূর্ব বাংলার এই বর্ষার সান্নিধ্যে আসার অনেক আগেই। কিন্তু পূর্ব বাংলার এই প্রকৃতির সান্নিধ্যে পাওয়া বর্ষায় তা যেন তাঁর নিজের কাছেই আরও চিত্রল, আরও অনুভবময় হয়ে উঠেছিল। তিনি তখন আর ওই গানের রচয়িতা ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন আমাদেরই মতো সে গানের শ্রোতা, আত্মমগ্ন হয়ে গাইতে থাকা শ্রোতা।
১২৯৮ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩০২ বঙ্গাব্দ–টানা পাঁচ বছরের বর্ষা এইভাবে পলি ফেলেছে বাংলা ভাষার সাহিত্যে। অন্য কোনো বাংলা সনের বর্ষা আর এমন করে মহিমান্বিত হয়নি বাংলা সাহিত্যে। মাঝেমধ্যে ভাবি বর্ষার সেই দিনটির কথা, যখন তিনি ছিলেন সাজাদপুরে–হয়তো বৃষ্টি নেমেছিল, হয়তো মেঘ জমেছিল; কিংবা সেসবের কিছুই নয়, মেঘ-বৃষ্টি জমেছিল তাঁর নিজের মনের নীরবতায়, আর তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত সেই গান, যা আনমনা করে দেয় আমাদের চিরকাল–'বড় বেদনার মতো তুমি বেজেছ হে আমার প্রাণে।'
বর্ষার এই স্নিগ্ধ বিষণ্ন আকাশ, সেই আকাশজুড়েই যেন খেলা করে চলে তাঁর লেখা কথাগুলো, 'তোমারে হৃদয়ে করে আছি নিশি দিন ধরে/ চেয়ে থাকি আখি ভ'রে মুখের পানে।' আচ্ছা, কোন সে মুখ তখন দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের সবগুলো চোখ জুড়ে? সে কি কেবলই মুখ, নাকি অন্তহীন এক চাওয়া, অন্তহীন এক যাত্রা, যা কেবল পাওয়া যায় যেখানে কেবল পৌঁছানো যায় নীরবতাকে হৃদয়ে আত্মস্থ করে? আনমনা মনে করতে করতে, আনমনা গাইতে গাইতে যখন এইখানে আসি, যখন বলি, 'এ জন্মের মতো আর হয়ে গেছে যা হবার/ ভেসে গেছে মন প্রাণ মরণটানে', তখন কণ্ঠ কেমন রুদ্ধ হয়ে আসে, অথচ কোথায় যেন এই গান তার পরও বেজে চলে। তখন ঘনঘোর বর্ষার সমারোহে গোধূলির মেঘলা অন্ধকারে নির্জন ঘরে আমারও রবীন্দ্রনাথের মতো চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে, তাঁর মতো 'মৃদমন্দস্বরে গল্প করে যাবার মতো চিঠি'।
কিন্তু চিঠিকে কি আর সেই নির্জন ঘরের গল্প করে তোলার শক্তিসামর্থ্য সবার থাকে? বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারের রবীন্দ্রনাথই এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেন, 'আমাদের মনের খুব সহজ ইচ্ছাগুলিই বাস্তবিক দুঃসাধ্য। সেগুলি হয় আপনি পূর্ণ হয়, নয় কিছুতে পূর্ণ হয় না। অনেক সময় যুদ্ধ জমানো সহজ, কিন্তু গল্প জমানো সহজ নয়।'
