নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন: সীমান্তে পুশ ইন বন্ধের আহ্বান বাংলাদেশের
ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে সীমান্তে রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের নাগরিকসহ ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশ-ইনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
একইসঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার এবং বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) বিজিবির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।
গত ৮ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। ভারতের পক্ষে ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ-এর মহাপরিচালক প্রবীন কুমার।
পুশ-ইন নিয়ে উদ্বেগ ও প্রটোকল অনুসরণের তাগিদ
সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, 'সম্প্রতি সীমান্তে পুশ-ইনের ঘটনাগুলো সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং পূর্ববর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপন্থী।'
তিনি পুশ-ইন হওয়া ব্যক্তিদের চরম দুর্দশা, অসুস্থতা ও প্রবীণদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। বিজিবি প্রধান স্পষ্ট করেন যে, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হলে তাকে প্রচলিত আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত গ্রহণ করা হবে।
বিএসএফ মহাপরিচালকও বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাইকরণ বিষয়গুলো দ্রুত সম্পন্ন করে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। উভয় পক্ষই পারস্পরিক আস্থা ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সীমান্ত হত্যা ও নিরাপত্তা
সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বিজিবি তা শূন্যে নামিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং মানবাধিকারসম্মত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে। উভয় পক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, যৌথ টহল বৃদ্ধি এবং অবৈধ পারাপার রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে একমত হয়। সীমান্তে প্রতিটি হত্যার ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বিরোধী অবস্থান
ভারত থেকে বাংলাদেশে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক এবং আগ্নেয়াস্ত্র চোরাচালান রোধে কঠোর অবস্থান নেয় বিজিবি। এ বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর মহাপরিচালক পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিএসএফ জানায়, ভারতও মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতিতে অটল। দুই বাহিনীই গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত নেয়।
রোহিঙ্গা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যু
রোহিঙ্গাদের ভারতে অনুপ্রবেশ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে বিজিবি জানায়, বাংলাদেশ কখনোই তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। বরং বিজিবি অনেক ক্ষেত্রে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় রোহিঙ্গাদের আটক করেছে।
অন্যদিকে, ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য উপস্থিতি এবং তাদের বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানায় বিজিবি। জবাবে বিএসএফ নিশ্চিত করে, ভারত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয় না।
অবকাঠামো নির্মাণ ও নদী ব্যবস্থাপনা
সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফের বিভিন্ন নির্মাণকাজ ও গবাদিপশুর বেড়া দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ। বিজিবি জানায়, অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন ছাড়া অবকাঠামো তৈরির চেষ্টা হয়েছে। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।
এছাড়া মুহুরী চরসহ বিভিন্ন এলাকায় সীমান্ত পিলার স্থাপন, কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন, রহিমপুর খালের খনন ও নদীতীর সংরক্ষণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেয় বিজিবি। বাংলাদেশ জানায়, প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অভাবে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির সেচ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অপপ্রচার রোধ ও পরবর্তী সম্মেলন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়। সম্মেলন শেষে দুই দেশের মহাপরিচালকরা সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। আগামী নভেম্বরে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
