পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ মানেই জাতীয় উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে বিনিয়োগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, পারমাণবিক প্রযুক্তিতে আমাদের বিনিয়োগ আসলে জাতীয় উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং মানুষের কল্যাণের পেছনেই বিনিয়োগ।
তিনি বলেন, 'আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পারমাণবিক শক্তি এক অনন্য দায়িত্বও বয়ে নিয়ে আসে। একটি সফল পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য কেবল প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি নিরাপত্তা ও সুরক্ষার একটি সুদৃঢ় সংস্কৃতি।'
মন্ত্রী আজ শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে পাবনার ঈশ্বরদীর স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের সভাকক্ষে 'পারমাণবিক জ্বালানি: কৌশল, বাস্তবতা ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা' শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, 'গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি (ফুয়েল) লোড করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্যই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি যুগান্তকারী জাতীয় মুহূর্ত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের সেইসব উন্নত ও পরিশীলিত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশগুলোর কাতারে শামিল হলো, যারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি সফলভাবে ব্যবহার করছে। এই অর্জন আমাদের নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কয়েক দশকের দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং নিষ্ঠারই প্রতিফলন।'
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী আরও বলেন, 'গত পাঁচ দশকে আমাদের দেশ এক বিশাল চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি থেকে রূপান্তরিত হয়ে বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ও স্থিতিস্থাপক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে আমরা অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছি।'
তিনি বলেন, 'আমাদের অর্থনীতি যত বিকশিত হচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। আমাদের শিল্পকারখানা সচল রাখতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে, নাগরিক সেবার মান বাড়াতে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি অপরিহার্য। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।'
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, 'আমাদের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। এটি আমাদের জাতীয় গৌরবের বিষয়। এটি আমাদের আত্মবিশ্বাস, আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে।'
তিনি বলেন, 'পারমাণবিক শক্তি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বড় পরিসরে নির্ভরযোগ্য ও কম-কার্বনযুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। অন্যান্য অনেক জ্বালানি উৎসের মতো এটি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করে, শিল্পখাতের বিকাশ ঘটায় এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বে অবদান রাখে।'
মন্ত্রী আরও বলেন, 'পুরোদমে চালু হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আমাদের জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করবে। এটি আমাদের জ্বালানির মিশ্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং আমাদের অর্থনীতির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তবে, পারমাণবিক প্রযুক্তির মূল্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যানসার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায়, উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিতে, উন্নত প্রয়োগের মাধ্যমে শিল্পখাতে, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পারমাণবিক বিজ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।'
মন্ত্রী তার বক্তৃতায় আরও বলেন, 'আগামী আগস্টের শেষের দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে।' এসময় আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে ২য় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হবে বলে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, 'আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা রয়েছে জাতীয় গ্রিডে এখান থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।'
মন্ত্রী আরও বলেন, 'এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখানে হওয়ায় এই এলাকার লোক ভাগ্যবান। এটি বড় শহর হবে, সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ঈশ্বরদীবাসী।'
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু তালেব মণ্ডল, পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, অ্যাম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল প্রমুখ।
সেমিনারে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. কবির হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা, ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ শোয়াইবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
