হরমুজে বিধ্বস্ত মার্কিন হেলিকপ্টারের ক্রুদের উদ্ধার করা সেই সমুদ্র ড্রোন আসলে কী?
সোমবার হরমুজ প্রণালির কাছে বিধ্বস্ত হওয়া একটি মার্কিন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে একটি মার্কিন সামুদ্রিক ড্রোন উদ্ধার করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এ ধরনের নৌযান কোনো উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে—এ কথা মার্কিন সামরিক বাহিনী এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানালো।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আঞ্চলিক জলসীমায় টহল দেওয়ার সময় ওমান উপকূলের কাছে তাদের এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয় এবং ওই দুই 'সেনাসদস্যকে প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। তারা বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে টহল দেওয়ার সময় ইরান বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি দেশটির বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার নির্দেশ দেন।
দুই ক্রু সদস্যকে একটি চালকবিহীন ভাসমান ড্রোনের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়। মার্কিন নৌবাহিনীর ওই ড্রোনটির নাম 'করসেয়ার'। এটি পরিচালনা করছিল টাস্ক ফোর্স ৫৯, বলে জানান মার্কিন নৌবাহিনীর অধিনায়ক টিম হকিন্স।
তিনি বলেন, টাস্ক ফোর্স ৫৯ হলো বাহরাইনভিত্তিক একটি ইউনিট, যা ২০২১ সালে গঠিত হয় এবং মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম ইউনিট হিসেবে সম্পূর্ণভাবে চালকবিহীন ব্যবস্থার পরিচালনায় কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে এটি মানবচালিত ও চালকবিহীন ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়। চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে ইউনিটটি মধ্যপ্রাচ্যে 'করসেয়ার' নৌযান মোতায়েন শুরু করে।
ড্রোনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সারোনিক টেকনোলজিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ফুট দীর্ঘ এই নৌযানটির নকশা দ্রুতগতির স্পিডবোটের মতো। এটি সর্বোচ্চ ১ হাজার পাউন্ড (৪৫৩ দশমিক ৫ কিলোগ্রাম) পর্যন্ত বহন করতে পারে এবং এক হাজার নটিক্যাল মাইলেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৫ নট।
যুক্তরাষ্ট্র পানির ওপর চলাচলকারী চালকবিহীন নৌযান এবং পানির নিচে পরিচালিত চালকবিহীন যান—উভয়ই ব্যবহার করে। এসব ড্রোন নজরদারি, মাইন শনাক্তকরণ, শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ব্যবহৃত হয়। কিছু ড্রোনকে যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী করেও তৈরি করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঝুঁকি কমানো এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিরক্ষা বিভাগ এ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী টেক্সাসভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সারোনিক টেকনোলজিসকে তাদের স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক নৌযান 'করসেয়ার' উৎপাদনের জন্য ৩৯ কোটি ২০ লাখ ডলার (২৯ কোটি ৩৩ লাখ পাউন্ড) মূল্যের একটি চুক্তি দেয়। নৌবাহিনীর পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে শত শত, এমনকি সম্ভাব্যভাবে হাজার হাজার করসেয়ার নৌযান মোতায়েনের কথা রয়েছে, যদিও প্রযুক্তিটি এখনও বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন কারিগরি ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
হকিন্স জানান, পানিতে প্রায় দুই ঘণ্টা কাটানোর পর ওই দুই সেনাসদস্যকে চালকবিহীন নৌযানটি খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় রাত ১১টা ৩৩ মিনিটে) ওই দুই ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'উদ্ধার অভিযানটির নেতৃত্ব দেয় মার্কিন নৌবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন। এতে সহায়তা করে মার্কিন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, যার মধ্যে পঞ্চম নৌবহরের টাস্ক ফোর্স ৫৯ও ছিল।'
যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ব্যবস্থা নয়, তবু রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহারের ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে। এসব ড্রোন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে একটি হেলিকপ্টার পর্যন্ত ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, যা চালকবিহীন নৌযানের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
