দেশি ও স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী বৃক্ষরোপণ কেন বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অপরিহার্য?
আমার জন্ম আর শৈশব কেটেছে বরিশালের প্রত্যন্ত এক গ্রামে। আর এই নিবন্ধ লিখছি ঠিক আমার ছোটবেলার সেই গ্রামে বসেই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। মালকোহা, বউ কথা কও, পাতি চোখ গেলো, রাতচোরা, প্যাঁচাসহ অসংখ্য পাখপাখালির ডাক ভেসে আসছে। কিন্তু ছোটবেলার মতো গ্রামটি আজ নেই। আজ আগের মতো সেই সবুজে ঢাকা, ঘন বাগান, লতাগুল্মসমৃদ্ধ গ্রাম—যেখানে ছিল হাজারো পাখপাখালি, পতঙ্গ আর জোনাকির মেলা—তা একেবারে অনুপস্থিত। সবুজ গ্রামগুলো আজ কবিতায়-গল্পে থাকলেও তথাকথিত উন্নয়নের ছোঁয়া গ্রামগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশকেও করছে বিপন্ন। যার ফলে অপরিকল্পিতভাবে সবুজশূন্য হচ্ছে সারাদেশ।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়, জলাভূমি সংকোচন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারানোর মতো বহুমাত্রিক সংকট আমাদের পরিবেশকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশি গাছ রোপণের উদ্যোগ এবং দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মহাপরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী, দূরদর্শী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এই উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মনে হলেও, এটি বাংলাদেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের একটি সম্ভাবনাময় ভিত্তি হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর—কী গাছ লাগানো হচ্ছে। কারণ শুধু সংখ্যার বিচারে কোটি কোটি গাছ লাগানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশি এবং স্থানীয় পরিবেশোপযোগী বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, ঝোপঝাড় ও জলজ উদ্ভিদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার নিজস্ব পরিচয়। তাই এখানে সরকারের আন্তরিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগকে প্রশাসনের উপলব্ধি করা, গবেষকদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিবেশকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকৃতিকে পুনর্জাগরণের অনন্য পদক্ষেপ।
কিন্তু এই বিষয়টি বাস্তবায়নে সরকারকেই মনোযোগ দিতে হবে কিছু বিষয়ে। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, আমাদের এই রোপণকৃত গাছগুলো যেন আবাসস্থল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখে এবং আবাসস্থল বিশেষায়িত প্রাণীদের আবাসস্থল সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রকৃতির স্বকীয়তা ও স্থানীয় উদ্ভিদের গুরুত্ব নির্ণয়
প্রকৃতির প্রতিটি অঞ্চল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বহন করে। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল, শালবন, মধুপুর গড়, সুন্দরবন, হাওড়, বিল, চরাঞ্চল কিংবা উপকূলীয় অঞ্চল—প্রতিটি স্থানের পরিবেশ, মাটি, জলবায়ু এবং জীববৈচিত্র্যের গঠন আলাদা। এই ভিন্নতার কারণেই গড়ে উঠেছে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিস্ময়কর বৈচিত্র্য।
বাংলাদেশ ২২টি জীব-পরিবেশীয় অঞ্চলে বিভক্ত। আর এই ২২টি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য আলাদা, উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্য আলাদা। আর তাই আমাদের এই বিষয়গুলো সবার আগে নজরে রাখতে হবে, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে তার কথায় উল্লেখ করেছেন।
একটি অঞ্চলের উদ্ভিদবৈচিত্র্যই মূলত নির্ধারণ করে সেখানে কী ধরনের প্রাণী বাস করবে। পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, পতঙ্গ, এমনকি অণুজীবের জীবনচক্রও স্থানীয় উদ্ভিদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো দেশীয় বৃক্ষ হারিয়ে গেলে সেই অঞ্চলের পুরো প্রতিবেশব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এ কারণেই এখন সময় এসেছে পুরোনো স্লোগান 'গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান'-কে নতুন বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে বলার, 'দেশি ও অঞ্চল-উপযোগী গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান'।
আগে জানতে হবে কোন গাছ হারিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাকৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গাছ
বৃক্ষরোপণের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো একটি এলাকার স্থানীয় উদ্ভিদসম্পদ চিহ্নিত করা। অতীতে কোন গাছ ছিল, কোনগুলো এখনও টিকে আছে এবং কোনগুলো বিলুপ্তির পথে—এসব তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।
একটি এলাকার বৃক্ষ, তরু, লতা, গুল্ম, ঝোপঝাড় এবং সংশ্লিষ্ট প্রাণিকুলের বিন্যাস বিশ্লেষণ না করে বৃক্ষরোপণ করলে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত সুফল পাওয়া যায় না। বরং ভুল পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
সুতরাং, দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রথম ধাপ হওয়া উচিত অঞ্চলভিত্তিক উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্যের বৈজ্ঞানিক জরিপ। স্থানীয় জনগণের স্মৃতি, পুরোনো বন ব্যবস্থাপনা নথি, গবেষণা প্রতিবেদন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তথ্য ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের দেশীয় উদ্ভিদের তালিকা প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
বিদেশি গাছের একক বনায়ন কেন সমস্যার সৃষ্টি করেছে?
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি গাছের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে আকাশমণি ও ইউক্যালিপ্টাস সামাজিক বনায়ন, রাস্তার ধারে, সরকারি প্রকল্প এবং অনেক বনাঞ্চলে ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়েছে।
প্রথমদিকে এসব গাছ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও পরিবেশগত বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
ইউক্যালিপ্টাস মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ পানি শোষণ করে। ফলে আশপাশের জমি শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এর পাতা সহজে পচে জৈবপুষ্টিতে পরিণত হয় না। ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে আকাশমণির একক বনায়নে নিচু স্তরের গুল্ম, ঘাস ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ জন্মাতে পারে না। এতে বনভূমির প্রাকৃতিক স্তরবিন্যাস নষ্ট হয়ে যায়।
প্রকৃত বন কেবল বড় গাছের সমষ্টি নয়। সেখানে থাকে ছোট গাছ, লতা, ঝোপঝাড়, ঘাস, ছত্রাক, পচনশীল জৈব পদার্থ এবং অগণিত অণুজীব। এই জটিল সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে একটি সুস্থ প্রতিবেশব্যবস্থা। বিদেশি একক প্রজাতির বনায়ন এই সম্পর্ককে দুর্বল করে বনকে জীববৈচিত্র্যহীন কাঠের বাগানে পরিণত করে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। বিশেষ করে শালবন ও চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ভুল বৃক্ষরোপণ কীভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে প্রাকৃতিক বনকে, তা সহজেই অনুমেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বন বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিষিদ্ধ এই গাছ রোপণের পুনঃপ্রচেষ্টা এবং অবৈজ্ঞানিক চিন্তার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি নার্সারিতে ৪০ লক্ষ টিকে থাকা আকাশমণির চারা রোপণের প্রচারণা ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের সরকারি এই উদ্যোগের লক্ষ্যকে বিভ্রান্ত এবং পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ করে তুলতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি নার্সারিতে টিকে থাকা চারার এই সংখ্যা যদি হিসাব করা হয়, তাহলে তা হয়তো কয়েক কোটি হবে, যা বর্তমান সরকারের পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনাকে পরিবেশের জন্য হুমকিজনক করার নীরব দুরভিসন্ধি।
দেশীয় গাছ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান
হাজার বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দেশীয় বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
একটি বটগাছ, পাকুড়গাছ কিংবা ডুমুরগাছ প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের উৎস। কদম, চালতা, করচ, বরুণ, পলাশ, শিমুল, শেফালি, ডেউয়া, জাম, ছাতিম, অর্জুন, বেত, বাঁশসহ বিভিন্ন দেশীয় উদ্ভিদ অসংখ্য পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী ও ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণীর জীবনধারণে সহায়তা করে।
বিভিন্ন ফলজ দেশীয় বৃক্ষ মৌসুমভেদে খাদ্য সরবরাহ করে। ফুল উৎপাদনকারী দেশীয় গাছ মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গকে আকর্ষণ করে। এই পতঙ্গ আবার কৃষি উৎপাদন ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদের বংশবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু বিদেশি গাছভিত্তিক বনায়নে এই খাদ্য ও আশ্রয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফলে পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি, উভচর ও সরীসৃপ প্রাণীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
সংরক্ষিত এলাকার বাইরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের একটি বড় অংশ জাতীয় উদ্যান বা সংরক্ষিত এলাকার বাইরে বসবাস করে।
গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বহু প্রজাতির প্রাণী গ্রামীণ বন, শহুরে সবুজ এলাকা, কৃষিজমির আশপাশের ঝোপঝাড়, জলাভূমির পাড় এবং মানুষের বসতির কাছাকাছি পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।
মেছো বিড়াল, খেঁকশিয়াল, উদ্বিড়াল, রেসাস বানর, যশোরের হনুমান, মুখপোড়া হনুমান, বুনো খরগোশ, মায়া হরিণ, বিন্টুরং, গাঙ্গেয় শুশুক ও হাতির মতো প্রাণীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসব প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর নির্ভরশীল।
পাখিদের মধ্যে ধলা-গলা মানিকজোড়, রাঙা মানিকজোড়, কালা মানিকজোড়, কালোমাথা কাস্তেচরা, দেশি গাঙচোষা, ছোট মদনটাক, ধলাকপাল রাজহাঁস এবং পালসি কুড়া ঈগলের মতো প্রজাতি জলাভূমিনির্ভর উদ্ভিদবৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আবার হলদে চোখ ছাতারে, কাঠময়ূর ও রাজ ধনেশের মতো বননির্ভর পাখিরা দেশীয় বনজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে।
সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। কচ্ছপ, গুইসাপ, অজগর, ঘড়িয়াল এবং বহু প্রজাতির ব্যাঙ জলাভূমি ও দেশীয় উদ্ভিদসমৃদ্ধ আবাসস্থলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
সরকারি আবাসিক এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হতে পারে জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বলতে আমরা সাধারণত জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য বা সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বহু বিপন্ন ও হুমকিগ্রস্ত বন্যপ্রাণী আজ সংরক্ষিত এলাকার বাইরেও টিকে আছে। বিশেষ করে সরকারি আবাসিক এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সামরিক স্থাপনার সবুজ অঞ্চল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি দপ্তরের বিস্তীর্ণ সবুজ চত্বর বর্তমানে অনেক প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
এসব এলাকায় তুলনামূলকভাবে বৃক্ষ আচ্ছাদন বেশি, মানুষের চাপ কম এবং কিছুটা নিরাপদ পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় নানা ধরনের পাখি, সরীসৃপ, উভচর, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং অসংখ্য পতঙ্গ বসবাস করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব এলাকা শহর ও জনবসতির মধ্যে জীববৈচিত্র্যের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শিয়াল, মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, খাটাশ, উদ্বিড়াল, বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়, বানর, কাঠবিড়ালি, গুইসাপ, সাপ, কচ্ছপ, ব্যাঙ এবং শতাধিক প্রজাতির পাখির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অনেক পরিযায়ী পাখিও প্রতিবছর এসব এলাকায় আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে বড় জলাশয়, পুরোনো বৃক্ষ এবং দেশীয় উদ্ভিদসমৃদ্ধ ক্যাম্পাসগুলো জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব এলাকায় অনেক সময় সৌন্দর্যায়নের নামে বিদেশি শোভাবর্ধনকারী গাছ অথবা জীববৈচিত্র্যের জন্য কম উপযোগী বৃক্ষ লাগানো হয়। ফলে বন্যপ্রাণীরা পর্যাপ্ত খাদ্য, আশ্রয় ও প্রজননস্থল পায় না।
তাই সরকারি আবাসিক এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে ক্ষুদ্র সংরক্ষিত এলাকা বা 'নগর জীববৈচিত্র্য অভয়ারণ্য' হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব স্থানে পরিকল্পিতভাবে বন্যপ্রাণীবান্ধব দেশীয় গাছ লাগানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে বট, অশ্বত্থ, পাকুড়, ডুমুর, চালতা, ডেউয়া, কদম, জাম, বরই, করচ, হিজল, বরুণ, ছাতিম, অর্জুন, পিটরাজ, শিমুল, বকুল, বেল, আমলকী, বনজ ফলদ বৃক্ষ, বাঁশ ও বেতজাতীয় উদ্ভিদ অধিক পরিমাণে রোপণ করা উচিত। এসব গাছ বিভিন্ন সময়ে ফল, ফুল, মধু, পাতা এবং আশ্রয় প্রদান করে পাখি, বাদুড়, কাঠবিড়ালি, প্রজাপতি, মৌমাছি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জীবনধারণে সহায়তা করে।
একইসঙ্গে শুধু বড় গাছ নয়, দেশীয় ঝোপঝাড়, গুল্ম, লতা এবং জলাশয়ের চারপাশে দেশীয় জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ অনেক উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং কীটপতঙ্গ এসব নিম্নস্তরের উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে যখন দেশের প্রাকৃতিক আবাসস্থল দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, তখন সরকারি আবাসিক এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও দেশীয় উদ্ভিদভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব এলাকা ভবিষ্যতে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং নগর সংরক্ষণ এলাকার সফল উদাহরণে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাই এসব সবুজ অঞ্চলকে শুধু সৌন্দর্যের জায়গা হিসেবে নয়, বরং জীবনের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন
দেশীয় বৃক্ষরোপণকে সফল করতে হলে অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা পরিবেশগত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য যে বৃক্ষ উপযোগী, তা হয়তো হাওড় অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত নয়। আবার শালবনের উদ্ভিদবিন্যাস সুন্দরবনের সঙ্গে মিলবে না।
এক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, বনবিদ্যা, পরিবেশবিজ্ঞান ও ভূগোল বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে অঞ্চলভিত্তিক দেশীয় উদ্ভিদ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু গাছ নয়, পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে
অনেক সময় বৃক্ষরোপণ বলতে আমরা কেবল বড় গাছ লাগানো বুঝি। কিন্তু প্রকৃতিতে একটি বন গড়ে ওঠে বিভিন্ন স্তরের উদ্ভিদের সমন্বয়ে।
বৃক্ষের পাশাপাশি প্রয়োজন লতা, গুল্ম, ঝোপঝাড়, ঘাস, বাঁশ, বেত এবং জলাভূমিভিত্তিক দেশীয় জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ।
বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোতে দেশীয় জলজ উদ্ভিদ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে জলচর পাখি, ব্যাঙ এবং জলজ সরীসৃপ তাদের আবাস ও খাদ্য হারাচ্ছে। তাই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে জলাভূমির দেশীয় উদ্ভিদ পুনরুদ্ধারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে হবে
দেশীয় বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হলে শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য।
বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা তাদের এলাকার হারিয়ে যাওয়া গাছ চিহ্নিত করতে পারে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে যুক্ত হতে পারে।
একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকে জানে কেন হিজল, করচ, কদম, চালতা, পাকুড়, বট বা ডুমুর গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে ভবিষ্যতে সে প্রকৃতি সংরক্ষণের একজন সচেতন নাগরিক হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সবার দেশীয় সবুজের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রকৃতি কোটি কোটি জীবের আবাসভূমি। প্রকৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু বন রক্ষা নয়, বরং একটি জীবন্ত ও কার্যকর প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা করা।
দেশীয় উদ্ভিদ, দেশীয় প্রাণী এবং স্থানীয় পরিবেশগত সম্পর্কের সমন্বয়েই একটি সুস্থ বন গড়ে ওঠে। বিদেশি প্রজাতির একক বনায়ন কখনো প্রকৃত বন সৃষ্টি করতে পারে না।
আজ প্রয়োজন দেশীয় বৃক্ষভিত্তিক একটি জাতীয় আন্দোলন। রাস্তার পাশে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সরকারি স্থাপনায়, গ্রামীণ বসতিতে, শহুরে পার্কে এবং জলাভূমির আশপাশে স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী দেশীয় গাছ লাগাতে হবে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া দেশীয় লতা, গুল্ম, ঝোপঝাড় ও জলজ উদ্ভিদ ফিরিয়ে আনতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ২৫ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এই কর্মসূচিকে বিজ্ঞানভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক এবং জীববৈচিত্র্যবান্ধব রূপ দেওয়া। তাহলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কেবল সবুজায়নের প্রকল্প হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি, বন এবং জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
প্রকৃতি তার নিজস্ব পরিচয় ফিরে পাক, দেশীয় বৃক্ষ আবার ছায়া দিক বাংলার মাঠ-ঘাটে, আর সেই সবুজের বুকে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাক বাংলাদেশের বিপন্ন বন্যপ্রাণী—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
- আশিকুর রহমান সমী: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ (বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
