পরিশোধিত মূলধন ২,০০০ কোটি টাকার কম থাকলে কোনো ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না
ব্যাংকিং খাতের সার্বিক মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা ও ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা ও বিতরণের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
শনিবার (২৩ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম, তারা কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না।
এছাড়া যেসব ব্যাংক সব ধরনের সংবিধিবদ্ধ বা আইনি শর্ত পূরণ করে মুনাফা বিতরণের যোগ্যতা অর্জন করবে, তারা তাদের মোট ঘোষিত লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ নগদে পরিশোধ করতে পারবে।
এই নির্দেশনাগুলো ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে লভ্যাংশ বিতরণে কঠোর সর্বোচ্চ সীমা আরোপ করা হলেও, ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ জারি করা ডিওএস সার্কুলারসহ পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্ট সার্কুলারগুলোর অন্যান্য সমস্ত বিদ্যমান নির্দেশনা পুরোপুরি বহাল ও কার্যকর থাকবে।
ব্র্যাক ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কেবল ব্র্যাক ব্যাংকই নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রয়োজনীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকলেও ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেশি থাকায় তারা লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে বর্তমানে ভালো ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ সব সূচকে প্রথম দিকে থাকা কোন ব্যাংকই নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন টিবিএসকে বলেন, আর্থিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ এর আগে কিছু ব্যাংক দুর্বল মূলধন অবস্থা সত্ত্বেও উচ্চ হারে নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করেছে।
তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই নীতিতে শক্তিশালী ও দুর্বল সব ব্যাংককে একইভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করলে সুপরিচালিত ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি রেশিওকে (সিএআর) কেন প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হলো না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি যুক্তি দেন, ন্যূনতম ১২.৫ শতাংশের পরিবর্তে যেসব ব্যাংকের সিএআর পরিস্থিতি অনেক বেশি শক্তিশালী—যেমন ১৭-১৮ শতাংশ—তাদের নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত।
নতুন এই নীতির সঙ্গে করের নিয়মকানুনগুলো কীভাবে সমন্বয় করা হয়, তা দেখার জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন বলেও জানান।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার এই উদ্যোগ ইতিবাচক। কারণ এর আগে কিছু দুর্বল ব্যাংক নাজুক আর্থিক অবস্থা সত্ত্বেও মাত্রাতিরিক্ত নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, লভ্যাংশ অনুমোদনের বিষয়টি সিএআরের সঙ্গে যুক্ত করাটা ভালো বিকল্প হতে পারত। বিশ্বের অনেক দেশেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখনও মূলধনের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামে অনেক সময়ই সেগুলোর প্রকৃত পারফরম্যান্সের প্রতিফলন ঘটে না।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত মূলধন থাকা ব্যাংকগুলোকে নগদ লভ্যাংশ দিতে বাধা দেওয়া হলে তা পুঁজিবাজারকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে। ফলে যেসব বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন জোগাচ্ছেন, তাদের উৎসাহও কমে যাবে।
