হোয়াইট হাউসের ‘চাপে’ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তার পদ ছাড়লেন তুলসী গ্যাবার্ড
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের (ডিরেক্টর অভ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স—ডিএনআই) পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তুলসী গ্যাবার্ড। শুক্রবার তিনি বলেন, বিরল হাড়ের-ক্যানসারে আক্রান্ত স্বামীর পাশে থাকতেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যদিও সূত্রের দাবি, হোয়াইট হাউস গ্যাবার্ডকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ ডিজিটালের প্রতিবেদন অনুসারে, শুক্রবার ওভাল অফিসে এক বৈঠকের সময় ট্রাম্পকে নিজের পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানান তুলসী। আগামী ৩০ জুন তার এই ইস্তফা কার্যকর হবে।
সমাজমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া পোস্টে নিজের পদত্যাগপত্র প্রকাশ করেছেন তুলসী। সেখানে ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, 'গত দেড় বছর ধরে ডিরেক্টর অভ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের মতো কার্যালয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ এবং আমার প্রতি আপনার আস্থার জন্য আমি গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ।'
স্বামী আব্রাহাম উইলিয়ামস সম্প্রতি হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেছেন, 'এমন একটি চূড়ান্ত ব্যস্ততা ও সময়সাপেক্ষ পদে বহাল থেকে তাকে (স্বামীকে) এই কঠিন লড়াইয়ে একা ছেড়ে দেওয়া বিবেকের কাছে মেনে নেওয়া যায় না।'
নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানিয়েছেন, জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের বর্তমান প্রধান উপ-পরিচালক অ্যারন লুকাস ভারপ্রাপ্ত জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক লুকাস ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ন্যাশনাল সিকিয়োরিটি কাউন্সিলে কর্মরত ছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক পদে তুলসীর কাজ 'অত্যন্ত প্রশংসনীয়'। তবে স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়ার পর 'তিনি সঙ্গত কারণেই তার পাশে থাকতে চেয়েছেন। কঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনাই এখন তার লক্ষ্য।'
তবে বিষয়টির সম্পর্কে একটি সূত্র জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস তুলসী গ্যাবার্ডকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল এক্স-এ বলেছেন, স্বামীর অসুস্থতার কারণেই পদ ছাড়ছেন তুলসী।
এর আগে ইরান প্রসঙ্গে তুলসীর সঙ্গে মতবিরোধের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তার তুলনায় তুলসীর মনোভাব অনেকটাই 'নমনীয়'।
এপ্রিলেই একাধিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় বড়সড় রদবদল হতে পারে; তাতে পদ হারাতে পারেন তুলসী।
ওই সময় হোয়াইট হাউসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছিলেন, গত কয়েক মাস ধরে তুলসীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প।
এ বিষয়ে সরাসরি অবগত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তুলসীর যোগ্য বিকল্প কে হতে পারেন, সে ব্যাপারে ঘনিষ্ঠ মহলে মতামতও জানতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে বিতর্কিত কার্যকাল
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক কংগ্রেস সদস্য তুলসীকে যখন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক করেছিলেন ট্রাম্প, তখন গোয়েন্দা বিভাগে তার বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় আল কায়েদার হামলার পরেই দেশের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার তদারকির জন্য এই জাতীয় গোয়েন্দা দপ্তর তৈরি করা হয়েছিল।
হাওয়াই ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য তুলসী ২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরাকে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি সেনা কর্মকর্তা হন। এরপর ইউএস আর্মি রিজার্ভ-এ যোগ দিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদেও উন্নীত হন।
মার্কিন কংগ্রেস থেকে বিদায় নেওয়ার পরে রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থান নিতে দেখা যায় তুলসীকে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টিতেও যোগ দেন তিনি।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের জন্য ন্যাটোকেই কাঠগড়ায় তুলেছিল মস্কো। তুলসীর কথায়ও কার্যত একই সুর শোনা যাওয়ায় ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই দলেরই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে। এছাড়া ২০১৭ সালে দামেস্ক সফরে গিয়ে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যও তিনি সমালোচিত হন। সে সময় সিরিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছিল এবং আসাদ রাশিয়া ও ইরানের সমর্থন পাচ্ছিলেন।
গোয়েন্দা প্রধান হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ তোলেন, গ্যাবার্ড তার পদটিকে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর 'প্রতিশোধ' নিতে পদটিকে ব্যবহার করছিলেন তুলসী। এমনকি ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির জেরে ট্রাম্পকে হারতে হয়েছিল—এই ভিত্তিহীন দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতেও করতেও তুলসী নিজের পদের অপব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে না, এমন একটি মূল্যায়ন করেছিলেন তুলসী। কিন্তু গত জুনে ট্রাম্প বলেন, তুলসীর ওই মূল্যায়ন ভুল। মূলত এরপর থেকেই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করে।
সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক আলোচনাগুলোতে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠক থেকে বাদ পড়ছিলেন তুলসী। ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মার্কিন সামরিক অভিযান, ইরান যুদ্ধ ও কিউবা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর আলোচনায় তিনি জায়গা পাননি।
গ্যাবার্ডের বিদায়ের বিষয়ে অবগত সূত্রটি রয়টার্সকে বলেছে, 'হোয়াইট হাউস তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। হোয়াইট হাউস বেশ কিছুদিন ধরেই তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিল।'
ওই সূত্রের আরও দাবি, প্রশাসনের এই অসন্তোষের অন্যতম কারণ ছিল তুলসীর তৈরি ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ নামক টাস্কফোর্সের বেশ কিছু পদক্ষেপ। সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যা-সংক্রান্ত গোপন নথি প্রকাশ্যে আনা, ভোটযন্ত্রের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখা ও করোনার উৎস অনুসন্ধানের মতো বিষয়ে কাজ করছিল দলটি।
ওই সূত্র জানায়, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তুলসীর দ্বন্দ্বের আরও একটি কারণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত আগস্টে ৩৭ জন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করেছিলেন তুলসী। এর ফলে বিদেশে গোপন অভিযানে নিযুক্ত এক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার নাম প্রকাশ্যে চলে আসে।
গোয়েন্দা বিভাগকে 'রাজনীতিমুক্ত' করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তুলসী। সিআইএর সাবেক পরিচালক জন ব্রেনান-সহ একাধিক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছিলেন তিনি।
