জ্বালানি সংকট অব্যাহত: ভারতে প্রতিদিন এলপিজি’র ঘাটতি ৪ লাখ ব্যারেল
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারকারী দেশ ভারত। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি আমদানি মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ায় দেশটিতে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল রান্নার গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েও মেটানো যাচ্ছে না।
অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে দেশটিতে এলপিজি আমদানি দাঁড়িয়েছে দৈনিক ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬২০ ব্যারেলে, যা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিদিনের গড় আমদানি অর্থাৎ ৮ লাখ ৫১ হাজার ৮৭০ ব্যারেলের অর্ধেকেরও কম। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি ছিল সংঘাতের জেরে তেহরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার আগের শেষ মাস, যখন এই জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল। অন্যদিকে, এপ্রিল মাসে ভারতের অভ্যন্তরীণ এলপিজি উৎপাদন প্রতিদিন প্রায় ৭৫ হাজার ব্যারেল বেড়ে ৫ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে।
কেপলারের রিফাইনিং ও সাপ্লাই বিভাগের প্রধান বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ এলপিজি উৎপাদন এখন প্রায় পূর্ণ সক্ষমতার (ফুল ক্যাপাসিটি) কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এর অর্থ হলো, আমদানি পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সরবরাহের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মূল্য বৃদ্ধি এবং মজুত পরিস্থিতি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিন পর, মার্চের শুরুতে ভারত ১৪.২ কেজির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৬০ রুপি (০.৬২ ডলার) বাড়িয়ে দেয়। ওই মাসে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ কমে যায় এবং পরবর্তী এপ্রিল মাসেও বার্ষিকভিত্তিতে ১২.৭ শতাংশ পতন ঘটে। এর ফলে এপ্রিল মাসে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১.৯ লাখ মেট্রিক টনে, যা প্রতিদিনের হিসাবে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেলের কিছু বেশি।
ভারতে এলপিজি-র কোনো দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত রিজার্ভ বা মজুত নেই। তবে গত ১১ মে সেদেশের সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশটিতে ৪৫ দিনের "রোলিং স্টক" (চলতি মজুত) রয়েছে, পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে প্রতিটির ৬০ দিনের মজুত রয়েছে।
ভারত সাধারণত তার মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমদানি করে থাকে। তবে এই আমদানির ওপর হুমকি কেবল হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, যে জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে ভারতের মোট এলপিজি আমদানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসত। কেপলারের তথ্যমতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং সৌদি আরব—এই চার দেশ মিলে সাধারণত ভারতের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। কিন্তু যুদ্ধকালীন হামলায় এই দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কিছু অংশ মেরামত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। ফলে এই চার দেশ থেকে ভারতের এলপিজি আমদানি এপ্রিল মাসে প্রতিদিন ১ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ কম।
ঘাটতি মেটাতে ভারত ইরান, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা এবং চিলির মতো দেশগুলো থেকে এলপিজি কিনে তার আমদানি উৎস বহুমুখীকরণের চেষ্টা করেছে। এপ্রিল মাসে এই চার দেশ থেকে দৈনিক গড়ে ৪৩ হাজার ব্যারেল এলপিজি এসেছে, যার পরিমাণ ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল শূন্য। তবে এই পরিমাণটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান চার সরবরাহকারী—আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদির ফেব্রুয়ারি মাসের মোট চালানের (দৈনিক ৬ লাখ ৭৮ হাজার ব্যারেল) তুলনায় অনেক কম।
পরিবহন সময় ও দীর্ঘ নৌপথের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষক রিতোলিয়া জানান, বিকল্প উৎস অস্ট্রেলিয়া থেকে এলপিজির চালান ভারতে পৌঁছাতে প্রায় ২০ দিন সময় লাগে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসতে সময় লাগে ৩৫ থেকে ৪৫ দিন (গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতে প্রতিদিন ১ লাখ ৪৯ হাজার ব্যারেল এলপিজি রপ্তানি করেছে)। এর তুলনায় হরমুজ প্রণালি হয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চালান আসতে মাত্র ৫ থেকে ৬ দিন সময় লাগত।
এপ্রিল মাসে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসা সরবরাহ তীব্রভাবে কমে দৈনিক ১ লাখ ২৭ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল দৈনিক ৬ লাখ ৮৭ হাজার ব্যারেল। অপরদিকে, উত্তমাশা অন্তরীপ এবং সুয়েজ খাল-সহ অন্যান্য বিকল্প রুট দিয়ে আসা এলপিজির সরবরাহ এপ্রিল মাসে প্রতিদিন ২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
পাইপলাইনের গ্যাস ও কালোবাজারের দাপট
ঘাটতি কমাতে ভারত সরকার, ভোক্তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত পাইপলাইনের গ্যাস (পিএনজি) ব্যবহারে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বাজারে ইলেকট্রিক চুলার (স্টোভটপ) বিক্রি ব্যাপকভাবে বাড়ছে।
এপ্রিল মাসে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন— ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ২.৭৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটারে পৌঁছেছে, যা কেপলারের মতে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন এলএনজি'র সমান। তবে এপ্রিলে এলএনজি আমদানি ফেব্রুয়ারি মাসের মতোই প্রায় অপরিবর্তিত (১৯ লাখ টন) ছিল।
গত মার্চ মাসে ভারত আরও ৫ লাখেরও বেশি নতুন পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ দিয়েছে, তবে তা এখনও মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর বিপরীতে দেশটিতে এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি।
সরবরাহের এই চাপ মূলত রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দামেও প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ৯৯৩ রুপি (১০ ডলার) দাম বাড়ানোর ফলে, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো শহরগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম ৩,০০০ রুপি ছাড়িয়ে গেছে। এই সংকট এলপিজি-র ধূসর এবং কালোবাজারেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য সরকার নির্ধারিত সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৯১৫ রুপি হলেও, কালোবাজারে তা এখন ৩,০০০ রুপিরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কালোবাজারি বিক্রেতা বলেন, "খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায় এপ্রিলে ক্রেতাদের চাহিদা কিছুটা কমতে দেখেছি। কিন্তু মানুষের হাত-পা আসলে বাঁধা, কারণ রান্নার অন্য কোনো জ্বালানিতে হঠাৎ চলে যাওয়া সবার জন্য এত সহজ না।"
