যে কারণে সোনা কেনা ও বিদেশ ভ্রমণে ভারতীয়দের নিরুৎসাহিত করছেন মোদি
ইরানে চলমান যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা না থাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীর প্রতি এমনভাবে খরচ কমিয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন, যা করোনা মহামারির পর আর দেখা যায়নি।
গত রোববার হায়দরাবাদে এক জনসভায় মোদি দেশবাসীর প্রতি অনেকগুলো অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, যেখানে সম্ভব সেখান থেকে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' (বাড়ি থেকে কাজ) করুন। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন। সোনা কেনা কমান এবং জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনুন।
প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন করোনা আমলের সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন তিনি জাতীয় স্বার্থে সাধারণ মানুষকে প্রতীকীভাবে একজোট হওয়ার ডাক দিতেন। তবে এবার লক্ষ্য ভিন্ন; এখনকার লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা অর্থাৎ ডলার সাশ্রয় করা। প্রত্যাশিতভাবেই মোদির এই বার্তায় ভারতের আর্থিক বাজারে এক ধরণের আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
ভারতের প্রবীণ ব্যাংকার উদয় কোটাক চলতি সপ্তাহে শিল্প নেতাদের এক সভায় বলেছেন, 'আমার মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত। আমাদের সবথেকে খারাপ সময়ের জন্য তৈরি থাকতে হবে।'
কোটাক আরও সতর্ক করে বলেন, 'গত দুই মাসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দামের যে পরিবর্তন, তার প্রতিফলন আমরা এখনও (ভারতের বাজারে) দেখিনি। এটি আসছে এবং বেশ বড় আকারেই আসছে। সাধারণ মানুষ এখনও সেই চাপ টের পায়নি।'
ভারতের এই সংকটের কারণ বেশ সহজবোধ্য। দেশটিকে তাদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশ এবং গ্যাসের অর্ধেকই আমদানি করতে হয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি—যার মাধ্যমে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়—তা যুদ্ধের কারণে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিমান সংস্থাগুলো জ্বালানির বাড়তি খরচ টিকিটের ওপর চাপানোয় বিমান ভাড়া আকাশচুম্বী হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকার সোনা ও রুপা আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে।
মুম্বাইভিত্তিক ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের সহযোগী অধ্যাপক রাজেশ্বরী সেনগুপ্ত বলেন, 'শুরুতে যা সাময়িক ধাক্কা মনে করা হয়েছিল, তা এখন দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিতে পারে। যদি তেমনটি হয়, তবে ভারত সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে।'
মোদির এই সরাসরি আহ্বানের পেছনে দিল্লির বড় ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। বিষয়টি এমন নয় যে ভারতের ডলারভান্ডার ফুরিয়ে যাচ্ছে—১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিও নয়। তবে ডলারের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় জোগান বাড়ছে না বলেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১৯৯১ সালে ভারতের কাছে মাত্র তিন সপ্তাহের আমদানির খরচ মেটানোর মতো রিজার্ভ ছিল। কিন্তু বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৬৯০ বিলিয়ন ডলার—যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং টানা ১১ মাসের পণ্য আমদানির জন্য যথেষ্ট। ফলে ভারতের ঋণখেলাপি হওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও চাপগুলো অত্যন্ত বাস্তব।
তেল, গ্যাস, সার এবং সোনা আমদানির কারণে ডলারের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। ঠিক একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমেছে, রপ্তানি শ্লথ হয়ে পড়েছে এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৮ বিলিয়ন ডলার কমেছে—যা এই অঞ্চলে অন্যতম বড় পতন।
ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টায় জোর দিয়ে বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা হচ্ছে।
জাপানি ব্রোকিং হাউজ নোমুরার বিশ্লেষক অরদীপ নন্দী এবং সোনাল ভার্মা বলেন, 'মোদীর মন্তব্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সরকারের কোষাগারের ওপর চাপ এখন চূড়ান্ত সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। রুপির আরও অবমূল্যায়ন সহ্য করার ক্ষমতা এখন কম এবং পরিস্থিতির এই বাড়তি বোঝা হয়তো ধাপে ধাপে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হতে পারে।'
নোমুরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ভারতের 'ফিসকাল ডেফিসিট' (আর্থিক ঘাটতি) বেড়ে জিডিপির ৪.৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা বাজেটের ৪.৩ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এছাড়া 'ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট' ঘাটতি ইতোমধ্যে ৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন সম্প্রতি বলেছেন, রুপির মান নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে এ বছরের প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, রুপির এই সংকট যুদ্ধের আগে থেকেই ছিল এবং কেবল কৃচ্ছ্রসাধন নীতির মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব নয়।
গত কয়েক মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন। বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্দা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হুমকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের মতো উদীয়মান শিল্পে ভারতের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাই এর মূল কারণ।
গবেষক রাজেশ্বরী সেনগুপ্ত বলেন, 'যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সেমিকন্ডাক্টরের মতো খাতে ভারত তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি, তাই এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী লাভের যে সম্ভাবনা দেখছেন, ভারতে তা অনুপস্থিত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশ হলেও সামগ্রিক বিনিয়োগের চিত্রটি এখন খুব একটা জোরালো নয়।'
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা আসায় এ বছর রুপির মান এখন পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ শতাংশ কমেছে, যা একে এশিয়ার অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত করেছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ও লেখক রুচির শর্মা সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেন, 'আমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় ভারতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের এমন অনীহা আমি আগে কখনো দেখিনি।'
অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, ভারতের সামনে এখন অর্থনৈতিক কষ্ট মেনে নেওয়া ছাড়া খুব বেশি পথ খোলা নেই। তেলের চড়া দামের মতো বৈশ্বিক ধাক্কাগুলো অনিবার্যভাবে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, মুদ্রার মান কমিয়ে দেয় এবং মানুষের কেনাকাটার চাহিদাও কমিয়ে ফেলে।
পেট্রোল দামি হলে মানুষ গাড়ি চালানো কমিয়ে দেয়, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবারগুলো খরচ সাশ্রয় করে। তবে রুপির মান কমে যাওয়ার একটি ইতিবাচক দিকও আছে—এটি আমদানির খরচ বাড়ালেও রপ্তানিকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
তবে অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, ভারত সব সময় মুদ্রার অবমূল্যায়নকে কেবল একটি অর্থনৈতিক সমন্বয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখেছে। নীতিনির্ধারকরা রুপির তীব্র পতনের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। প্রতি ডলারে রুপির মান ১০০-এর দিকে চলে যাওয়া হবে অর্থনৈতিক দুর্বলতার এক বড় প্রতীক।
২০১৩ সালে মোদি নিজেই রুপি পড়তি হওয়া নিয়ে তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সরকার অর্থনীতি বা রুপির পতন নিয়ে চিন্তিত নয়, তারা শুধু 'নিজেদের গদি বাঁচাতে' ব্যস্ত।
এখন কেবল বাজারদরের ওপর চাহিদা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব না ছেড়ে মোদি নৈতিক প্রভাব ব্যবহার করছেন—যেখানে তিনি জাতীয় স্বার্থে ভারতীয়দের স্বেচ্ছায় ভোগ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে বার্তাটি পরিষ্কার: যদি জোগান বাড়ানো না যায়, তবে চাহিদাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
প্রশ্ন হলো, দেশপ্রেমের খাতিরে করা কৃচ্ছ্রসাধন কি বাজারের কঠোর হিসাবের বিকল্প হতে পারে?
ফাউন্ডেশন ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রাহুল আলুওয়ালিয়া বিবিসিকে বলেছেন, 'ভোক্তাদের বিশ্ববাজারের সরবরাহের ধাক্কা থেকে পুরোপুরি আড়ালে রাখা উচিত নয়, কারণ এতে পরে আরও বেশি কষ্ট পেতে হবে।'
তিনি আরও যোগ করেন, এখন ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে গেলে ভবিষ্যতে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে, জ্বালানি রূপান্তরের গতি কমে যেতে পারে এবং সরকারের কোষাগারের ওপর চাপ বাড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ক্রমবর্ধমান লোকসান সামাল দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
আসল বিতর্ক তেলের দাম বাড়বে কি না তা নিয়ে নয়, বরং প্রশ্ন হলো এই বর্ধিত দামের কষ্টের বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বইবে।
গত দুই মাস ধরে কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের কারণে ভারত সরকার তেলের আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধির ধাক্কা নিজে হজম করেছিল এবং খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে দেয়নি। কিন্তু বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় লোকসান সামাল দিতে গত শুক্রবার ভারত চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে। দিল্লিতে খুচরা বিক্রেতারা প্রতি লিটারে তিন রুপি (৩ শতাংশের বেশি) দাম বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ রাজেশ্বরী সেনগুপ্তর মতে, কৃত্রিমভাবে জ্বালানির দাম সস্তা রেখে সবাইকে দীর্ঘ সময় সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
এর পরিবর্তে বিশেষজ্ঞরা 'সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক' সহায়তার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তাদের মতে, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো বিশেষ ভর্তুকি (বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে) দেওয়া উচিত, আর বাকি সবার জন্য বাজারদর অনুযায়ী দাম বাড়তে দেওয়া প্রয়োজন।
ভারতে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি বর্তমান পরিস্থিতিকে 'বড় বৃদ্ধির আগের শান্ত অবস্থা' বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, জ্বালানি সংকট এবং 'এল নিনো'র (আবহাওয়ার একটি বিশেষ পরিবর্তন যা তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়) দ্বিমুখী ধাক্কায় সামনের দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়াতে বাধ্য হবে।
গত কয়েক বছর ধরে ভারতের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা প্রতিটি সংকট শিথিল করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তেলের বাজার বড়ই নির্মম। শেষ পর্যন্ত এর দেনা শোধ করতেই হয়—আর যত বেশি সময় দাম কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা হয়, পরবর্তী সমন্বয় তত বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
