কম্বোডিয়ায় মানবপাচার: চাকরির প্রলোভনে নিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি, নির্যাতন; মুক্তি মেলে পণ দিয়ে
রাজবাড়ীর বাসিন্দা মো. আলামিন একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করলেও ছিল না আর্থিক সচ্ছলতা। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে। ভালো চাকরির আশায় ধারদেনা করে বিপুল অর্থ দিয়ে পাড়ি জমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায়। সঙ্গে নেন ভাগ্নে মো. জাহিদ শেখকে (২২)।
কিন্তু ওই রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালে ছিল একটি মানবপাচারকারী চক্র, যারা আলামিন ও জাহিদকে ভালো চাকরির প্রলোভেনে ফেলে কম্বোডিয়ায় নিয়ে বিক্রি করে দেয় দেশটির এক স্ক্যাম সেন্টারে। সেখানে তাদের দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করানো হতো প্রতারণার কাজ। অনিহা প্রকাশ করলে নেমে আসতো নিষ্ঠুর শারীরিক নির্যাতন।
আলামিনের মতো আরও অনেকেই বৈধতার আবরণে তৈরি এমন প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্স ও যাচাইকৃত জব পারমিটের কথা বলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এই বিদেশযাত্রাকে সম্পূর্ণ অনুমোদিত ও বৈধ হিসেবে তুলে ধরে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজে বৈদেশিক আয় ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে অসহায় চাকরিপ্রার্থীদের প্রলুব্ধ করা হয়।
আলামিনের মতো রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালে থাকা মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পড়ে পড়ে এভাবে স্বপ্ন ভঙ্গ হচ্ছে হাজারো বাংলাদেশি যুবকের। রাজবাড়ীর বড় নূরপুর গ্রামের ৩৩ বছর বয়সি এই যুবক রনি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ও এমআর ইন্টারন্যাশনাল নামক দুটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ১০ লাখ টাকা দেন।
গত বছরের ৮ নভেম্বর তিনি তার ২২ বছর বয়সি ভাগ্নে জাহিদকে নিয়ে বৈধ কাজের আশায় বাংলাদেশ ছাড়েন। তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আলামিন টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের বলা হয়েছিল যে ওয়ার্কিং ভিসা দেওয়া হবে। কিন্তু ওই দেশে যাওয়ার পর বুঝতে পারি আমাদের ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়েছে।'
আলামিন আরও অভিযোগ করেন, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর ওই রিক্রুটিং এজেন্ট মো. গোলাম মোস্তফা মুকুল ও মো. আরিফ শেখ তাদের সঙ্গে থাকা ২ হাজার ৪০০ ডলার কেড়ে নেন। এরপর তাদের বাফেট স্ক্যাম সেন্টার নামে পরিচিত চীনাদের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
আলামিন বলেন, সেখানে তাদের ইলেক্ট্রিক শক দেওয়াসহ শারীরিক নির্যাতন করা হতো। এছাড়া জোরপূর্বক সাইবার জালিয়াতির কাজে বাধ্য করা হতো। ওই একই কম্পাউন্ডে তারা আরও দুই বাংলাদেশি—মো. সানোয়ার হোসেন (৩৬) ও মো. মহিদুলকে (৩৭) পান। তারাও একই রিক্রুটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেখানে গিয়েছিলেন বলে জানান।
ভয়ভীতি আর জোরজবরদস্তি সেখানে তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। কাজ করতে অস্বীকার করলেই জুটত কঠিন শাস্তি, আর নির্দেশ মানার অর্থ ছিল অনলাইন প্রতারণায় অংশ নেওয়া। একপর্যায়ে মাথাপিছু ১ হাজ্র ৫০০ ডলার মুক্তিপণ দেওয়ার বিনিময়ে এই চারজন নিজেদের মুক্তির বিষয়ে রফা করেন। কিন্তু সেই মুক্তিও সহজ ছিল না।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মুকুল তাদের পাসপোর্ট ফেরত দিতে অস্বীকার করেন এবং আরও ২ লাখ টাকা দাবি করেন। তারা বজানান, নিজেদের নথিপত্র ফিরে পেতে তাদের প্রত্যেককে আরও ৫০ হাজার টাকা করে দিতে বাধ্য করা হয়। শেষপর্যন্ত আলামিন ও তার ভাগ্নে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর নিজ খরচে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। অন্য দুজন চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি দেশে ফেরেন।
দেশে ফেরার পরও খোয়ানো টাকা আদায়ের চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের নিয়মিত হুমকি-ধমকির মুখে পড়তে হয়েছে। তারা রনি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মো. মাসুদ রানা (রনি) ও আবদুল্লাহ আল মামুনের (অপু) বিরুদ্ধে এই পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, মেসার্স বাংলাদেশ ও এমআর ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে বিএমইটি-অনুমোদিত চ্যানেল ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব ও বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই জালিয়াতি করা হয়েছে। পাওনা টাকা ফেরত চাইলেতাঁদের উল্টো হুমকি দেওয়া হয়।
ওই মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেও বেগ পেতে হয়েছে বলে অভিযোগ এই চার ভুক্তভোগীর। গত ৯ এপ্রিল থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভাটারা থানায় ঘুরে ২৫ এপ্রিল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, কোনো অভিযোগ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে মামলা নেওয়া যায় না, তাদের তদন্ত করতে হয়। 'ওই চার ভুক্তভোগীর মামলা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে।'
তাদের এই অভিজ্ঞতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষত কম্বোডিয়ায় মানবপাচারের একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে। উচ্চ বেতন আর সহজ অভিবাসনের চটকদার অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রমেই বাংলাদেশিদের প্রলুব্ধ করে দেশটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বিএমইটির তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ২ হাজার ৪০৮ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া গেছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন মানবপাচারের শিকার হয়ে ওই দেশে বিক্রি হয়েছেন সেই তথ্য নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে।
অধিকারকর্মী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়ায় মানবপাচারের প্রবণতা শুরু হয় ২০২১ সালের পর থেকে। অনলাইনে কম্বোডিয়ার ট্যুরিস্ট ভিসা বা ভিজিট ভিসা পাওয়া সহজ হওয়ায় এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্র কম্পিউটার অপারেটর, ডাটা এন্ট্রি বা কল সেন্টারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের দেশটিতে নিয়ে যায়। এরপর তাদের পাসপোর্ট রেখে বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পাচারকারীরা অনলাইন ট্যুরিস্ট ভিসার সহজলভ্যতা এবং বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সকে ব্যবহার করে এই অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নিচ্ছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ম্যানেজার আল-আমিন নয়ন টিবিএসকে বলেন, বিএমইটি ছাড়পত্রকে এখানে মানুষের আস্থা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এটি দেখে অভিবাসীরা মনে করেন যে তারা সঠিক ও অনুমোদিত পথেই বিদেশ যাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তারা বুঝতে পারেন, তাদের প্রতারিত করে ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালে ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় যান। এদের মধ্যে কতজনকে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করা হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমইটির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ূন কবীর টিবিএসকে বলেন, বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় জনশক্তি পাঠানোর কাজ আগে হতো। কিন্তু তিনি যোগদান করার পর গত তিন মাসে কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনামে কোনো জনশক্তি পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি।
বিদেশ গমনেচ্ছুদের সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া দরকার। লাওস, কম্বোডিয়া তো বাংলাদেশ থেকে ধনী দেশ নয়। তাহলে সেসব দেশে কেন যেতে হবে? বিদেশ যেতে ইচ্ছুক এবং তাদের অভিভাবকদের এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। আমরাও মানুষকে বিভিন্নভাবে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি।'
