ক্রিপ্টো প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া ৪৪.১৪ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনল সিআইডি
এমটিএফই পনজি স্কিমের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা) দেশে ফিরিয়ে এনেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চীনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ওকেএক্সে সংরক্ষিত এই অর্থ যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সহায়তায় দেশে ফেরত আনা হয়েছে।
মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বহু বিনিয়োগকারীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। প্রতারণামূলক ওই প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের পর এই উদ্ধারকাজ সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার।
২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট এক ভুক্তভোগী ডিএমপির খিলগাঁও থানায় মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর আওতায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, এমটিএফই বিনিয়োগ অ্যাপে প্রায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ বা এমটিএফই ২০২২ সালের জুনে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। ঘরে বসে সহজে আয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। ব্যবহারকারীদের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করে ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট খোলা, ক্রিপ্টোকারেন্সি জমা রাখা এবং প্রতিদিন লগইন করার মাধ্যমে মাসে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত আয়ের প্রলোভন দেখানো হতো। অন্যদের যুক্ত করলে অতিরিক্ত বোনাসের কথাও বলা হতো।
বাস্তবে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া; লাভ-ক্ষতির হিসাবও কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হতো। প্রকৃত অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে বাংলাদেশ থেকে বৃহৎ পরিসরে অর্থ পাচার করা হয়। কানাডায় নিবন্ধিত বলে দাবি করলেও দেশে তাদের কোনো অফিস ছিল না। বিনিয়োগকারী টানতে তথাকথিত 'টিম লিডারদের' ওপর নির্ভর করত এমটিএফই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই স্কিমটি শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার মানুষকে প্রলুব্ধ করে এবং ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ধসে পড়ে। যা ফলে লাখো মানুষ প্রতারণার শিকার হন।
সিআইডির অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেল
সিআইডির তদন্তে দেখা যায়, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ—প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউএসডিটি (টেথার)—ওকেএক্স এক্সচেঞ্জে সংরক্ষিত ছিল। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল 'চেইনঅ্যানালাইসিস রিয়্যাক্টর' ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই অর্থ এমটিএফই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পরবর্তীতে ওকেএক্সের আইন বিভাগ আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনতে সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সক্রিয় ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আদালতের হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় অর্থ গ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, জব্দ করা ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ মুদ্রায় রূপান্তর করে সরকারি হিসাবে স্থানান্তরের জন্য সিআইডি যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এর ফলে ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা) সোনালী ব্যাংকে সিআইডির হিসাবে জমা হয়েছে। ডিআইজি তালুকদার জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সহায়তার কারণে মামলা দায়েরের তিন বছরেরও কম সময়ে এই অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদঘাটন, ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণ এবং অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধারে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমটিএফই পনজি স্কিমের মাধ্যমে পাচার হওয়া বাকি অর্থ শনাক্ত ও দেশে ফেরত আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
