ভারতের বিপদে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বহির্বিশ্ব

আজ সোমবার (২৬ এপ্রিল) নাগাদ টানা পঞ্চম দিনের ন্যায় করোনায় সর্বোচ্চ রেকর্ড ভাঙ্গা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ভারতে। বিপর্যয়ের মাত্রায় শঙ্কিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, রোগীর ভিড়ে বেসামাল হাসপাতাল ব্যবস্থাকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি যোগাতে জরুরি চিকিৎসা উপকরণ সাহায্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তির কেন্দ্র বলে পরিচিত বেঙ্গালুরু শহর যে রাজ্যে অবস্থিত সেই কর্নাটকে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে লকডাউন চালু হচ্ছে, পাশের রাজ্য মহারাষ্ট্রে লকডাউনের সময়সীমা বেড়েছে ১ মে পর্যন্ত। কিছু রাজ্য অবশ্য চলতি সপ্তাহে পূর্বারোপিত বিধিনিষেধ শিথিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু, স্থানীয় নির্বাচনের ডামাডোলে শিথিল জোড়াতালি দেওয়া লকডাউন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যাপক লোকসমাগম দেশের অন্যান্য স্থানেও শক্তিশালী প্রাদুর্ভাব তৈরি করতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৩,৫২,৯৯১ জন নতুন রোগী, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা মূল সংক্রমণের একটি বড় অংশ অশনাক্ত রয়ে যাচ্ছে। তাই প্রকৃত চিত্র আরও মারাত্মক। হাসপাতালগুলোয় শয্যা ফুরিয়ে এসেছে, অক্সিজেন সরবরাহের অবস্থা একই। সরকারের তরফ থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি করার পরেও শ্বাসকষ্টের গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর ভিড় তৈরি করেছে কল্পনাতীত অক্সিজেন চাহিদা।
খোদ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পরিস্থিতি টালমাটাল, সেখানকার শ্রী গঙ্গারাম হসপিটালের মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "বর্ত্তমানে আমাদের হাসপাতালের অবস্থা (অক্সিজেন) চেয়ে-চিন্তে চলার মতো, সত্যিই এটা চরম সঙ্কটের মুহূর্ত।"
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে হীরা শিল্পের কেন্দ্র বলে পরিচিত সুরাট নগরীর একটি হাসপাতালে গত রোববার আগুন লাগে, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের উদ্ধার করে অন্যান্য হাসপাতালে পৌঁছে দেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু, নতুন হাসপাতালে আইসিইউ না পাওয়ায় পাঁচ রোগী মারা যান। আগুন থেকে বেঁচে গেলেও কোভিড থেকে রক্ষা না পাওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা সুরাটের পৌর কর্মকর্তারাই রয়টার্সকে জানান।
সকল নাগরিকের প্রতি টিকা নেওয়াসহ সতর্ক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
অন্যদিকে, একইসময় একের পর এক হাসপাতাল জরুরি নোটিশ জারি করে জানাচ্ছে, তাদের পক্ষে আর নতুন রোগীর চাপ নেওয়া সম্ভব নয়।
নয়াদিল্লির মতো সবচেয়ে মারাত্মক সংক্রমণ তাড়িত মহানগর সমূহে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী শ্মশান, যেখানে প্রতিমুহূর্তে পোড়ানো হচ্ছে একের অধিক শব। মৃতের ভিড় উপচে পড়ার মতোই, গতকাল নাগাদ প্রতি চার মিনিটে গড়ে দিল্লিতে একজনের প্রাণহানির কথা জানায় ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি।
এনডিটিভি টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে, বিহারের একটি শ্মশানে স্ট্রেচার সঙ্কটের কারণে তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী মিলে একটি শব হাতে ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উঠে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভারতীয় বংশদ্ভূত অধ্যাপক ভিপিন নারাং টুইটার পোস্টে বলেন, "আপনি যদি কখনো শবদাহে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে জেনে রাখুন, মৃত্যুর গন্ধ সেখানে উপস্থিত দাহকারীর শরীর ও মন থেকে কখনোই দূর হয় না।"
টুইট বার্তায় তিনি আরও বলেন, "দিল্লিতে থাকা আমার সব বন্ধু ও পরিজনের জন্য আজ মন বিষণ্ণ হয়ে আছে, আসলে সমগ্র ভারতই এ নরককুণ্ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।"
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভারতে ভ্যাকসিন উৎপাদনে দরকারি কাঁচামাল, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও সুরক্ষা সরঞ্জাম পাঠাবে। সাহায্য পাঠানোর ঘোষণা দিচ্ছে অনেক দেশ, তাদের দলে জার্মানিও যোগ দিয়েছে সম্প্রতি।
ভারতের মোট জনসংখ্যা ১৩০ কোটির বেশি, সেখানে সরকারি হিসেবেই সংক্রমিতের সংখ্যা ১৭.৩১ মিলিয়ন, মৃত ১,৯৫,১২৩। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ২৪ ঘণ্টায় ২,৮১২ জনের মৃত্যুর কথা জানালেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে বলছেন প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রায় সুনামির শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়েছে ভারতের জনজীবনে। থেমে গেছে অর্থনীতির চাকা, যার কারণে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ তেল আমদানিকারক দেশটিতে জ্বালানি তেলের চাহিদায় ধস নেমেছে। এই অবস্থায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তেল বিক্রেতা ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান।
বিপর্যয়ের জন্য মোদির মতো কিছু রাজনীতিককে দায়ী করা হচ্ছে যারা কিনা সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনের বিশাল সব সভা-সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে গাদাগাদি করে সমবেত হয়েছিলেন বিভিন্ন স্টেডিয়াম ও ময়দানে। মহামারির সাম্প্রতিক হালের জন্য দায়ী এসব কার্যকালাপের তীব্র নিন্দা করছেন ভারতীয় নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা।
- সূত্র: রয়টার্স