নতুন নিয়ম: যুক্তরাষ্ট্রে সেনাবাহিনীতে যোগদানের তালিকায় যোগ্য পুরুষদের নাম উঠবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে
যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রস্তাবিত নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী সব যোগ্য পুরুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক ড্রাফটের তালিকায় নিবন্ধন করার পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে তা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে পারে।
এই প্রস্তাবটি পেশ করেছে 'সিলেক্টিভ সার্ভিস সিস্টেম', যা প্রতিরক্ষা বিভাগের বাইরে একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। সংস্থাটি সম্ভাব্য সামরিক সেবার জন্য উপযুক্ত তরুণ আমেরিকান পুরুষদের একটি ডাটাবেজ সংরক্ষণ করে।
তবে এই উদ্যোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, যদি ইরানকে ঘিরে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আরও তীব্র আকার ধারণ করে, তাহলে আবার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (ড্রাফট) চালু হতে পারে।
নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে থাকা অধিকাংশ পুরুষকে বর্তমানেও নিবন্ধিত হতে হয়, তবে ২০২৬ অর্থবছরের 'ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট'-এর অংশ হিসেবে এই নিবন্ধীকরণ প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করার ম্যান্ডেট দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, 'এই আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে নিবন্ধনের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে পুরুষদের ওপর থেকে সরিয়ে সিলেক্টিভ সার্ভিস সিস্টেমের ওপর দেওয়া হয়েছে, যা ফেডারেল তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।'
৩০ মার্চ সংস্থাটি প্রস্তাবটি অফিস অব ইনফরমেশন অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্সে জমা দিয়েছে এবং বর্তমানে এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন এবং সিলেক্টিভ সার্ভিস সিস্টেমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার ইতিহাসে ছয়টি যুদ্ধে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ বা ড্রাফট কার্যকর করেছিল। বিপ্লবী যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ।
সবচেয়ে অজনপ্রিয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় প্রায় ১৮ লাখ আমেরিকানকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে ডাকা হয়েছিল। তবে ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক সেবা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে কংগ্রেসকে মিলিটারি সিলেক্টিভ সার্ভিস অ্যাক্ট সংশোধন করতে হবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় নিবন্ধন না করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা, পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং বহু অঙ্গরাজ্যে সরকারি আর্থিক সহায়তা ও চাকরির সুযোগ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। যদিও বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এ ধরনের অভিযোগে মামলা করা হয়।
বর্তমানে নারীরা ড্রাফটের আওতার বাইরে রয়েছেন। তবে কয়েকবার আইনপ্রণেতারা প্রতিরক্ষা নীতিমালার বার্ষিক বিলের সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্তির বিধান যুক্ত করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।
গত মাসে ইরান সংঘাতের শুরুতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করেননি। যদিও ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি বারবার 'চিরস্থায়ী যুদ্ধ'-এর অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএস-এর '৬০ মিনিটস' অনুষ্ঠানে একই ধরনের অস্পষ্ট মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, 'আপনি আপনার শত্রুকে বলবেন না, প্রেসকেও বলবেন না, কাউকে বলবেন না যে একটি অভিযানে আপনার সীমাবদ্ধতা বা শেষ সীমা ঠিক কতটুকু হবে।'
এর পর ফক্স নিউজের 'সানডে মর্নিং ফিউচারস' অনুষ্ঠানে সাংবাদিক মারিয়া বার্টিরোমো হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে জিজ্ঞেস করেন, যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানে সেনা পাঠাতে পারে।
লেভিট জবাবে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কোনো বিকল্পকে আগেভাগে টেবিল থেকে সরিয়ে দেন না। অনেক রাজনীতিবিদ দ্রুত তা করে ফেলেন। কিন্তু সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযানের সাফল্য মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে চান।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি বর্তমানে পরিকল্পনার অংশ নয়। তবে প্রেসিডেন্ট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সব বিকল্প খোলা রাখেন।'
লেভিটের এই বক্তব্য সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিনসহ অনেকের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে ইঙ্গিত মিলেছে যে, যদি প্রশাসন তরুণদের ড্রাফটে ডাকতে চায় বা ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ট্রাম্পের নিজস্ব 'মাগা' সমর্থকদের মধ্যেই তীব্র প্রতিরোধ দেখা দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল বিদেশে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতিই দেননি, বরং তার ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসকে আক্রমণ করার জন্য এই 'ড্রাফট' বা বাধ্যতামূলক নিয়োগের ইস্যুটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে লাস ভেগাসের এক সমাবেশে তিনি সমর্থকদের বলেছিলেন, 'তিনি (হ্যারিস) এখনই ড্রাফট ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। তিনি ড্রাফট ফিরিয়ে আনতে চান এবং আপনার সন্তানকে এমন একটি যুদ্ধে পাঠাতে চান যা কখনোই হওয়া উচিত না।'
নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে আটলান্টার এক জনসভায় তিনি বলেন, 'আপনার সকল ছেলেমেয়েরা ড্রাফট নোটিশ পাবে। অভিনন্দন, আপনাকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আপনাকে এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে লড়তে হবে যার নাম আগে কেউ শোনেনি। এটা কি সত্য নয়? এটা কি হাস্যকর নয়?'
