বেইলি রোডে ৪৬ মৃত্যু: বিল নিতে ফটকে তালা দিয়েছিল ‘কাচ্চি ভাই’, ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দুই বছর পর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে সিআইডি। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক তথ্য— আগুনের পর আতঙ্কিত গ্রাহকরা যখন জীবন বাঁচাতে নামার চেষ্টা করছিলেন, তখন কেউ যাতে খাবারের বিল না দিয়ে যেতে পারে সেজন্য রেস্টুরেন্টের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল 'কাচ্চি ভাই' কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ভবনের ছাদের গেটটিও তালাবদ্ধ থাকায় ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে বিপুল প্রাণহানি ঘটে।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক শাহ জালাল মুন্সী আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে কাচ্চি ভাইসহ সংশ্লিষ্ট ভবনের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের মালিক ও ম্যানেজারসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে নাম থাকা ২২ আসামি হলেন— চায়ের চুমুক কফিশপের স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের স্বত্বাধিকারী মো. রমজানুল হক নিহাদ, ম্যানেজার মুন্সি হামিমুল আলম বিপুল, কাচ্চি ভাই, খানাজ ও তাওয়াজ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল সিরাজ, চায়ের চুমুক কফিশপের স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জেইন উদ্দিন জিসান, জেস্টি রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মোহর আলী পলাশ ও মো. ফরহাদ নাসিম আলীম, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মতিন, ভবনের ৬ষ্ঠ তলার ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম খাঁন, মেজবানিখানা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী লতিফুর নেহার, খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও অঞ্জন কুমার সাহা, এ্যামব্রোশিয়া রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. মুসফিকুর রহমান, পিৎজাইন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী জগলুল হাসান, স্ট্রিট ওভেন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আশিকুর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ তারেক, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ, মো. সাদরিল আহম্মেদ শুভ, আদিব আলম, রাফি উজ-জাহেদ ও শাহ ফয়সাল নাবিদ।
তদন্তে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেও মারা যাওয়ায় স্পেস মালিক এ কে নাসিম হায়দার ও ক্যাপ্টেন সরদার মো. মিজানুর রহমানকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া মো. আনোয়ার হোসেন সুমন ও শফিকুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদেরও অব্যাহতির সুপারিশ করেছে সিআইডি।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি লিপ ইয়ার উপলক্ষে খাবারে বিশেষ ছাড় দিয়েছিল কাচ্চি ভাই। ফলে সেখানে ভিড় ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। রাত পৌনে ১০টার দিকে ভবনের নিচতলায় 'চায়ের চুমুক' কফিশপের ইলেকট্রিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে পুরো ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, "জীবন বাঁচাতে সবাই যখন ছোটাছুটি করছিল, তখন কাচ্চি ভাই কর্তৃপক্ষ বিল আদায়ের জন্য গেটে তালা মেরে দেয়। সেখানে প্রথমে আগুন নয়, ধোঁয়া ছিল। সেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় আটকা পড়ে মানুষ অচেতন হয়ে মারা যায়।"
পুরো ভবনটিই ছিল অনিয়মে ঘেরা। সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, ৮ তলা ভবনটির ৫ তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদনের কথা থাকলেও পুরোটাই অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। ভবনের ১০টি রেস্টুরেন্টের কোনোটিরই বৈধ কাগজপত্র ছিল না। পুরো ভবনে কোনো ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা ছিল না, উল্টো একমাত্র সিঁড়িতে রাখা ছিল দাহ্য গ্যাস সিলিন্ডার ও মালামাল। ছাদেও অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল ডুপ্লেক্স রেস্টুরেন্ট এবং তার গেটেও তালা লাগানো ছিল।
আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন আরও জানান, "আগামী ১৯ এপ্রিল এই মামলার চার্জ গঠন শুনানি হবে। আমরা প্রতিটি আসামিকে আইনের আওতায় এনে অসাধু ও অমানবিক এই ব্যক্তিদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করব।"
অভিযোগের বিষয়ে কাচ্চি ভাই ও তাওয়াজ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল সিরাজ বলেন, "আমরা এখনো চার্জশিট হাতে পাইনি। অনলাইনে খবরটি দেখছি। তবে আমাদের গেটে তালা দেওয়ার বিষয়টি অবাস্তব। কারণ আমাদের সেখানে কোনো গেট ছিল না, ছিল কাঁচের দেয়াল। সেদিন আমাদের কর্মীরাই মই দিয়ে লোকজন নামিয়েছে, নিজেরা সিলিন্ডার নিচে ফেলেছে। আগুনের মধ্যে গেস্টদের তালাবদ্ধ রাখার তথ্য ভিত্তিহীন।"
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারির ওই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ৩ জন পুড়ে এবং ৪৩ জন ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা যান। ওই ঘটনায় রমনা মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন এসআই মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
