জ্বালানি সংকটে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যাহত, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটে দেশের নৌপথগুলোতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। এর প্রভাব শেষপর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দামে গিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে। সাধারণত বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাস করে ছোট ছোট হাজারো লাইটার জাহাজ দেশের বিভিন্ন নৌপথে তা পরিবহন করে থাকে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট অপারটররা বলছেন, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত চার সপ্তাহ ধরে ডিজেলের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনের গতি অনেকটাই কমে গেছে।
ব্যবসায়ী ও নৌপরিবহন পরিচালনাকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পাওয়ার কারণে নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছে। ফলে দেশের দ্রব্যমূল্য খাতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন টিবিএসকে বলেন, জ্বালানির এই সংকট ইতিমধ্যেই লজিস্টিক্যাল ও আর্থিক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, 'মাদার ভেসেল থেকে আমদানি করা পণ্য লাইটার হাজারের মাধ্যমে খালাস করা হয়। লাইটার জাহাজ যদি না চলে, তাহলে মাদার ভেসেল অলস বসিয়ে রাখতে হয়।
'জাহাজের আকারভেদে দৈনিক ১০ থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এই ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হয়, যার চূড়ান্ত প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়ে।'
বেসরকারি অপারেটর ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মালিকানাধীন প্রায় ২ হাজার ৫০০টি লাইটার জাহাজ চলাচল করে দেশের বিভিন্ন নৌ রুটে। এগুলো পরিচালনার জন্য দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়।
অপারেটররা বলছেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলেও সংকট তৈরি হয়। এরপর থেকে প্রয়োজনমতো জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিআইডাব্লিউটিসিসি) মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, প্রায় এক মাস ধরে জ্বালানি সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে পড়ছে।
তিনি বলেন, 'জ্বালানি সংকটে গতকালও আকিজ বশির গ্রুপের চারটি জাহাজ গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করতে পারেনি। ঈদের আগের তিন সপ্তাহসহ গত চার সপ্তাহ ধরে আমরা প্রয়োজনমতো জ্বালানি তেল পাচ্ছি না।'
তাদের সংস্থা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছে উল্লেখ করে পারভেজ বলেন, 'আমরা এর আগেও বিবৃতি দিয়েছি। অর্থমন্ত্রীকে জানিয়েছি। তিনি জ্বালানিমন্ত্রীকে বলেছেন রেশনিং না করতে। এরপরও সমস্যার সমাধান হয়নি। আমাদের দৈনিক চাহিদা ২ থেকে আড়াই লাখ লিটার। কিন্তু পাচ্ছি ৫০ হাজার লিটার।'
জ্বালানির এই সংকট জাহাজ পরিচালনার দৈনন্দিন পরিকল্পনাকেও ব্যাহত করেছে। সংস্থাটির অধীনে থাকা প্রায় ১ হাজার ৫০টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহন করে থাকে।
'দৈনিক ৮০টি জাহাজ পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এজন্য আমাদের প্রতিদিন বরাদ্দ সভা করা লাগত। কিন্তু সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা দুদিন পরপর বরাদ্দ সভা করছি,' বলেন পারভেজ।
ডিজেলের চাহিদা ও মজুত
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি হলো ডিজেল। সেচ, সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
বিপিসির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৪৩.৫০ লাখ টন। সে হিসাবে, মাসিক চাহিদা ৩.৬০ লাখ টন ও দৈনিক গড় চাহিদা ১২ হাজার টন।
দেশে ডিজেল সংরক্ষণের মোট সক্ষমতা ৬.২৪ লাখ টন। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য মজুত ছিল ১.৮৫ লাখ টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের ডিজেল মজুত আছে।
মেরিন ফুয়েলেও সংকটের আশঙ্কা
ডিজেল সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বড় জাহাজগুলোতে ব্যবহৃত মেরিন ফুয়েল নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে।
মাদার ভেসেলগুলো ০.৫ সালফারযুক্ত বিশেষায়িত মেরিন ফুয়েল (এলএসএফও) ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে চলতি মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুরে এই তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত মেরিন ফুয়েল থাকলেও বাড়তি দামের আশায় তা বাজারে ছাড়ছে না অনেকে।
গত ২ মার্চ পর্যন্ত বিপিসির কাছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন মেরিন ফুয়েল মজুত ছিল। এই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে প্রায় ৪৪ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএএ) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, বাংলাদেশে আসা বেশিরভাগ মাদার ভেসেল সিঙ্গাপুরে বাংকারিং (জ্বালানি সংগ্রহ) করে থাকে।
'এজন্য এখনও তেমন অস্থিরতা শুরু হয়নি। কিন্তু বৈশ্বিক প্রভাব দেশে পড়তে কতক্ষণ। পর্যাপ্ত মজুত প্রয়োজন,' বলেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ বন্দরগুলোতেও ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন
নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য নৌপথেও পণ্য পরিবহনে জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, ডিজেল সরবরাহ সীমিত থাকায় অনেক জাহাজ ও বাল্কহেড সময়মতো গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে না পারায় নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে।
এর পাশাপাশি কিছু জাহাজ অপারেটর ফ্রেইট চার্জও বেশি দাবি করছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
গম, ভোজ্যতেল, চাল, সিমেন্টের কাঁচামাল, সারসহ নৌপথে বিপুল পরিমাণ পণ্য নারায়ণগঞ্জে পরিবহন করা হয়। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার নৌপথগুলোতে সম্প্রতি জাহাজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
যেসব জাহাজ এখনো চলাচল করছে, জ্বালানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার কারণে সেগুলোর যাত্রাও প্রায়ই বিলম্বিত হচ্ছে। পাশাপাশি খোলাবাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেক মালিক নিজেদের জাহাজ অলস বসিয়ে রাখছেন।
জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রাফতার পেট্রোলিয়ামের মালিক মাসুম বিল্লাহ জানান, সরবরাহ ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, 'সাধারণত প্রতি মাসে আমাদের ৩ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা পাচ্ছি মাত্র ৮০ হাজার লিটারের মতো। এর ফলে অন্তত ৬০ শতাংশ কার্গো জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক জাহাজ নদীতে নোঙর করে রাখা হয়েছে।'
কৃষিপণ্যের পরিবহন খরচ বৃদ্ধি
জ্বালানি সংকটের কারণে নৌপথে কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, নৌকায় করে ধান পরিবহনের খরচ প্রতি ট্রিপে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জের ইটনার ব্যবসায়ী জগদীশ চন্দ্র দাস জানান, এক নৌকা ধান আশুগঞ্জে আনতে প্রায় ১৪০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, 'আগে আমরা প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় কিনতাম। কিন্তু সংকটের কারণে এখন তা ১১০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।'
আরেক ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলাম বলেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় এবং চালের বিক্রি আশানুরূপ না হওয়ায় সম্প্রতি ধানের দাম কমেছে। 'ডিজেলের দামের কারণে পরিবহন খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় ধানের দাম বাড়ছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।'
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিগগিরই জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে নৌপরিবহন খাতের এই অচলাবস্থা আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে দেশের সার্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।
