মৃত্যুর ৪৪ বছর পর সিগারেটের ডিএনএর সাহায্যে যেভাবে ধরা পড়ল মার্কিন কিশোরীর খুনি
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এক কিশোরীর হত্যাকাণ্ডের ৪০ বছরেরও বেশি সময় পর ফেলে দেওয়া একটি সিগারেটের টুকরো থেকে পাওয়া ডিএনএ-র সাহায্যে ঘাতককে ধরেছে কর্তৃপক্ষ।
১৯৮২ সালের ২৩ মে সন্ধ্যায় ক্যালিফোর্নিয়ার ক্লোভারডেল এলাকায় ১৩ বছর বয়সী সারাহ গিয়ারকে শেষবার তার বন্ধুর বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গিয়েছিল।
সোনোমা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, পরদিন সকালে কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে এক দমকলকর্মী সারার মরদেহ খুঁজে পান। কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, সারাহকে একটি গলির ভেতর দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পাশের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে একটি বেড়ার আড়ালে তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
সারাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করলেও তৎকালীন 'ফরেনসিক বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার' কারণে কোনো সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা যায়নি। ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মামলাটি অমীমাংসিত অবস্থায় ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে ছিল বলে জানান প্রসিকিউটররা।
সারাহর হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪৪ বছর পর, চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আদালত ৬৪ বছর বয়সি জেমস ইউনিককে এই খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। সোনোমা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় সিএনএনকে জানিয়েছে, কাকতালীয়ভাবে রায় ঘোষণার দিনটি ছিল নিহত সারাহর ৫৭তম জন্মদিন।
প্রসিকিউটররা জানান, জেনেটিক জিনিয়ালজি' পদ্ধতিতে এ রহস্যের সমাধান করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ডিএনএ প্রমাণের সাথে বংশলতিকার প্রথাগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্তকারীরা জেমস ইউনিকের ফেলে দেওয়া একটি সিগারেটের বাঁট থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করেন, যা সারাহর পোশাকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে মিলে যায়।
ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি কার্লা রদ্রিগেজ এক বিবৃতিতে বলেন, 'সোনোমা কাউন্টির আদালতে বিচার হওয়া এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরনো অমীমাংসিত মামলা। যদিও ৪৪ বছর অনেক দীর্ঘ অপেক্ষা, তবু শেষপর্যন্ত সারাহর পরিবার ও সমাজ ন্যায়বিচার পেয়েছে।'
তৈরি করা হয়েছিল ডিএনএ প্রোফাইল
প্রসিকিউটররা জানান, এ মামলায় প্রথম বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দেয় ২০০৩ সালে। সে সময় সারাহর অন্তর্বাস থেকে সংগৃহীত নমুনার ভিত্তিতে একটি ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়।
তবে ওই সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ডেটাবেজে থাকা কোনো ব্যক্তির ডিএনএর সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত ফের স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণত এই ডেটাবেজে আগে অপরাধ করেছে, এমন ব্যক্তিদের ডিএনএ সংরক্ষিত থাকে।
২০২১ সালে ক্লোভারডেল পুলিশ বিভাগ সারাহর মৃত্যুর কেসটি নতুন করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, ২০১৯ সালের শেষদিকে তারা একটি বেসরকারি তদন্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে। মামলার পুরনো সাক্ষ্য-প্রমাণগুলো যেন 'কোল্ড কেস' (দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত মামলা) সমাধানের আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নতুনভাবে পর্যালোচনা করা যায়, সেই লক্ষ্যেই তারা ওই সংস্থার সাথে কাজ শুরু করে।
প্রসিকিউটররা জানান, পারিবারিক বংশলতিকার বিশাল তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ আছে এফবিআইয়ের। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, সারাহর দেহ থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনাটি জেমস ইউনিকসহ ইউনিক পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে যেকোনো একজনের।
জেনেটিক জিনিয়ালজি যেভাবে রহস্যের জট খুলল
তদন্তকারীরা যখন সন্দেহভাজনদের তালিকা ছোট করে চার ইউনিক ভাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে আনার পর জেমস ইউনিকের ওপর নজরদারি শুরু করে এফবিআই। তারা আসামির ওপর নজরদারি চালিয়ে তার ধূমপান শেষে ফেলে দেওয়া একটি সিগারেটের বাঁট সংগ্রহ করেন।
ওই সিগারেটের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জেমস ইউনিকের ডিএনএর সঙ্গে ২০০৩ সালে তৈরি করা সেই ডিএনএ প্রোফাইলের পূর্ণ মিল রয়েছে। হত্যার দিন সারাহর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা অন্যান্য ডিএনএ নমুনার সঙ্গেও সেটি হুবহু মিলে যায়।
আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন শাখা জেনেটিক জিনিয়ালজির কল্যাণে তদন্তকারীরা এই রহস্যের জট খুলতে পেরেছেন। এটি ডিএনএ বিশ্লেষণ ও পারিবারিক বংশলতিকা নিয়ে গবেষণার একটি সমন্বিত রূপ।
এই প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত কোনো ডিএনএ নমুনার সাথে এমন একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারের তুলনা করা হয়, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের জেনেটিক প্রোফাইল দিয়ে রেখেছেন। এরপর তদন্তকারীরা বিভিন্ন তথ্য জোড়া লাগিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বংশলতিকা তৈরি করেন, যা নিখুঁতভাবে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
২০১৮ সালে কুখ্যাত গোল্ডেন স্টেট কিলারকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রেও এই জেনেটিক জিনিয়ালজি প্রযুক্তিটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া সম্প্রতি উইসকনসিনের ১৯৭৪ সালের একটি হত্যাকাণ্ড ও ওয়াশিংটনের ১৯৮৮ সালের একটি হত্যারহস্য উন্মোচনেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার উইলোজে জেমস ইউনিকের নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের সময় ইউনিক দাবি করেছিলেন, তিনি সারাহকে চিনতেন না; ওই রাতে কী ঘটেছিল, তা-ও তার মনে নেই। তবে মাসব্যাপী চলা বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি বয়ান বদলে ফেলেন।
প্রসিকিউটরদের তথ্যমতে, ইউনিক আদালতে বলেন, ক্লোভারডেলের একটি আর্কেডে ভিডিও গেম খেলার সময় কিশোরী সারাহ তাকে 'শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়'। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় একটি নদীর ধারের পাহাড়ের ঢালে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল।
প্রসিকিউটররা আরও জানান, ইউনিকের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যে সারাহকে ওই রাতেই পরে কেউ আক্রমণ বা হত্যা করে থাকতে পারে।
আদালতের জুরিরা ১৯৮২ সালের সেই উইকএন্ডে সারাহর সঙ্গে সময় কাটানো বন্ধুদের সাক্ষ্যও শোনেন।
মাত্র দুই ঘণ্টা পর্যালোচনার পর জুরিরা ইউনিকের দেওয়া যাবতীয় ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে তাকে খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন বলে জানান প্রসিকিউটররা।
আদালত ইউনিককে দোষী সাব্যস্ত করার পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছায় যে, আসামি খুনের সময় যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের সাথেও জড়িত ছিলেন। প্রসিকিউটরদের মতে, এর ফলে প্যারোলের সুযোগ ছাড়াই ইউনিককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
আগামী ২৩ এপ্রিল তার সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
