সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে শুরুতেই বিরোধ, রাজনৈতিক সম্প্রীতি নিয়ে শঙ্কা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর তারেক রহমান রাজনৈতিক ঐক্যের উদ্যোগ নেন। তিনি ফুল নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রধান ফজলুর রহমানের বাসভবনে যান। রাজনৈতিক ঐক্যের সেই দৃশ্য মন থেকে মুছতে না মুছতেই গতকাল সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায় বিএনপি।
গতকাল সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন। সংসদ সদস্যদের শপথের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে একটি বিশেষ শপথের আয়োজন করা হয়। তবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিএনপির এই অবস্থানের প্রতিবাদে প্রথমে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কোনো ধরনের শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে উভয় দলই শপথ নিলেও, বিকালের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করে।
এর ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে প্রকাশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
যদিও তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পর নির্বাচিত সংসদীয় সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে, তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদের প্রথম দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ঘিরে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধ ও সহযোগিতার টানাপড়েন বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতে আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক দেখা দিতে পারে। এতে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতাদের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জনকে নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন তারা।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক টিবিএসকে বলেন, সংসদ গঠন ও নতুন সরকারের যাত্রা মসৃণভাবে শুরু হওয়ার কথা ছিল। তারেক রহমানের বিরোধী নেতাদের বাসায় যাওয়া ছিল সৌহার্দ্যের বহিঃপ্রকাশ। বিজয়ের পর বিএনপি কোনো উৎসব করেনি। বরং দোয়া করেছে।
তিনি বলেন, 'শুরুর দিকটা খুবই মসৃণ ছিল। তবে শপথ অনুষ্ঠানের ঘটনার পর মনে হচ্ছে যাত্রাটা হোঁচট খেল। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত।'
ড. মালিকের মতে, মতপার্থক্য রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। তবে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। হঠাৎ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির 'হার্ডলাইন' অবস্থান অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি করেছে। এতে নতুন সংসদের সূচনায় 'প্রথম হোঁচট' তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল শেখ হাসিনার বিদায় এবং স্বৈরাচারমুক্ত দেশ গড়া। বর্তমানে সাধারণ মানুষ রুটি-রুজির সমস্যা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান নিয়ে বেশি চিন্তিত। সংবিধান নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক জনগণের কাছে তেমন সাড়া নাও পেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ টিবিএসকে বলেন, পরিস্থিতি অচলাবস্থা না হলেও বিলম্ব তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, 'গণভোট প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছিল, বিএনপি হয়তো সে বিষয়ে স্পষ্টতা চাইছে। এতে সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এখন বিএনপির হাতে। তাই বিষয়টি পুরোপুরি দলটির নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছে।
সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এটি সংস্কারকে শঙ্কায় ফেলবে না। তবে বিএনপির শপথ নেওয়া উচিত ছিল। এতে জনগণের আস্থা বাড়ত।'
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার টিবিএসকে বলেন, বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, 'শুরুর দিনেই একটি ইস্যুতে বিরোধ তৈরি হয়েছে। আমরা আশা করি সমস্যার সমাধান হবে। দেশ এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে।'
আরেকজন বিশ্লেষক বলেন, তারেক রহমান স্থিতিশীল সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন। তবে শুরুতেই মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন কঠিন হতে পারে।
মিত্রদের প্রতিক্রিয়া
শপথ অনুষ্ঠানের পর জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়কে সম্মান জানানো সবার দায়িত্ব। সংস্কার পরিষদে শপথ না নিয়ে বিএনপি জুলাইয়ের চেতনা ও গণভোটের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করেছে।
তিনি বলেন, 'বিএনপি যদি সত্যিই জুলাইকে সম্মান করে এবং সংস্কারকে ধারণ করে, তবে তারা এই শপথ নেবে।'
শফিকুর রহমান বলেন, 'মন্ত্রীদের শপথে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। তবে আমরা মানসিকভাবে ধাক্কা খেয়েছি। জুলাই শহীদদের অশ্রদ্ধা করতে পারি না। তাই ইচ্ছা থাকলেও যেতে পারিনি।'
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মাধ্যমে গণভোটের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। এতে সাংবিধানিক ও আইনি সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বিএনপির প্রতি দ্রুত শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এতে সংকট নিরসন হবে এবং সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রক্ষা পাবে।
