মার্কিন অভিবাসন এজেন্টের গুলিতে নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মিনিয়াপোলিসে উত্তেজনা তুঙ্গে
মিনিয়াপোলিসে মার্কিন অভিবাসন (আইসিই) এজেন্টের গুলিতে তিন সন্তানের জননী, ৩৭ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য এবং ফেডারেল কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এই ঘটনাটি স্থানীয় কর্মকর্তাদের তীব্র নিন্দার শিকার হয়েছে এবং অঙ্গরাজ্যসহ সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল কর্মকর্তারা একেবারেই ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দিচ্ছেন। ওই ঘটনায় একজন অজ্ঞাতইমিগ্রেশন এজেন্ট একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন নাগরিক রিনি নিকোল গুডকে গুলি করে হত্যা করেন।
কমিউনিটি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট পুলিশ ব্রুটালিটির প্রেসিডেন্ট মিশেল গ্রসের মতে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় স্থানীয় কর্মীদের উদ্যোগে গঠিত বহু 'নেইবারহুড প্যাট্রোল'-এর একটি কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছিলেন। স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্টদের দ্বারা গঠিত এই দলগুলোর কাজ হলো আইসিই-এর কর্মকাণ্ড অনুসরণ করা, পর্যবেক্ষণ করা এবং ভিডিও ধারণ করা।
মিনেসোটা ব্যুরো অফ ক্রিমিনাল অ্যাপ্রিহেনশন (বিসিএ) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা শুরুতে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এফবিআই-এর সাথে যৌথ তদন্ত করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ফেডারেল সংস্থাটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং তদন্তের একক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
বিসিএ সুপারিন্টেন্ডেন্ট ড্রু ইভান্সের মতে, এফবিআই পুরো তদন্তের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় অঙ্গরাজ্যের ক্রিমিনাল অ্যাপ্রিহেনশন ব্যুরো (বিসিএ) আর স্থানীয় প্রমাণ, মামলার নথি বা সাক্ষাৎকারগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবে না।
ইভান্স বলেন, 'এর ফলে, বিসিএ অনিচ্ছাসত্ত্বেও তদন্ত থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।'
অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক অ্যাটর্নি জেনারেল কিথ এলিসন সিএনএন-কে বলেন, এফবিআই-এর এই সিদ্ধান্তটি 'অত্যন্ত উদ্বেগজনক' এবং ফেডারেল সরকারের সহযোগিতা থাকুক বা না থাকুক, অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, তার দেখা প্রমাণগুলো—যার মধ্যে কিছু এখনও জনসমক্ষে আসেনি—ইঙ্গিত দেয় যে এই ঘটনায় অঙ্গরাজ্য ভিত্তিক ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সচিব ক্রিস্টি নোয়েম নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের জানান, বিসিএ-কে তদন্ত থেকে 'বাদ দেওয়া হয়নি', বরং এই বিষয়ে তাদের কোনো আইনি এক্তিয়ার নেই।
মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট গভর্নর টিম ওয়ালজ এক প্রেস কনফারেন্সে বলেন, অঙ্গরাজ্যকে বাদ দিয়ে যেকোনো ফেডারেল তদন্ত সম্ভবত একটি 'হোয়াইটওয়াশ' (অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা) হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি বলেন, 'আমি এই কথাটি কেবল একারণেই বলছি কারণ ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা... প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ক্রিস্টি নোয়েম পর্যন্ত সবাই ইতিমধ্যে এই ঘটনার বিচার করে ফেলেছেন এবং আপনাদের এমন সব তথ্য দিয়েছেন যা প্রমাণিতভাবেই মিথ্যা।'
এফবিআই বিসিএ-র বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
যে আইসিই এজেন্ট গুডকে গুলি করেছেন, তিনি ছিলেন সেই দুই হাজার ফেডারেল অফিসারের একজন যাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মিনিয়াপোলিস এলাকায় মোতায়েন করেছিল। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) বিষয়টিকে তাদের ইতিহাসের 'সবচেয়ে বড় অপারেশন' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নোয়েমসহ ডিএইচএস কর্মকর্তারা এই গুলি চালানোর ঘটনাটিকে আত্মরক্ষা হিসেবে সমর্থন করেছেন এবং ওই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন যে, তিনি 'অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদী' কর্মকাণ্ড হিসেবে এজেন্টদের ওপর গাড়ি তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মিনিয়াপোলিসের ডেমোক্র্যাট মেয়র জ্যাকব ফ্রে সরকারের এই দাবিকে 'বাজে কথা' এবং 'আবর্জনা' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এই মন্তব্য করেছেন ঘটনার সময় পথচারীদের ধারণ করা ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে, যা সরকারের দেওয়া বর্ণনার সরাসরি বিপরীত বলে মনে হয়েছে।
মেয়র ফ্রে এবং গভর্নর ওয়ালজ উভয়ই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি শহর থেকে ফেডারেল এজেন্টদের প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই এজেন্টদের উপস্থিতি রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রশাসন অন্যান্য শহর থেকে আরও ১০০ জনের বেশি অতিরিক্ত কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার পেট্রোল (সিবিপি) সদস্য মোতায়েন করছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের দেওয়া তথ্যগুলোকেই পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বারবার রিনি গুডের কর্মকাণ্ডকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর 'আক্রমণ' হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন যে ওই এজেন্ট 'কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য'। তিনি একজন ফেডারেল অফিসারের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা বা বিচারের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভিডিওতে গুলির ঘটনা
ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, দুজন মুখোশধারী পুলিশ কর্মকর্তা গুডের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। গাড়িটি মিনিয়াপোলিসের একটি রাস্তায় আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন কর্মকর্তা গুডকে গাড়ি থেকে বের হতে বলেন এবং গাড়ির দরজার হ্যান্ডেল ধরে টানছিলেন। গাড়িটি অল্প সময়ের জন্য পিছনে সরে যায় এবং পরে সামনের দিকে চলতে শুরু করে, ডানদিকে মোড় নেয়, যেন ঘটনাস্থল ত্যাগ করার চেষ্টা করছে।
তৃতীয় একজন অফিসার, যিনি এর আগে দৃশ্যটি ভিডিও করছিলেন, তিনি গাড়ির সামনে এসে বন্দুক বের করেন এবং পেছনে লাফ দেওয়ার সময় তিনবার গুলি ছোড়েন। শেষ গুলিগুলো চালকের জানালার ভেতর দিয়ে লক্ষ্য করা হয়েছিল তখন, যখন গাড়ির বাম্পার ওই অফিসারের শরীর অতিক্রম করে চলে গেছে বলে মনে হয়েছিল।
গাড়িটি ওই অফিসারের গায়ে লেগেছিল কি না তা ভিডিও থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়নি, তবে ঘটনার পর তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং হাঁটতে দেখা গেছে। নোয়েম জানিয়েছেন, ওই অফিসারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং ওই দিনই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়; অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন যে ওই নারী 'আইসিই অফিসারকে গাড়ি দিয়ে পিষে দিয়েছেন।'
স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্ট গ্রস রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রিনি গুড কয়েকশ সম্প্রদায়ের সদস্যের মতো নেইবারহুড 'অবজারভার' বা পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন এবং যখন তাকে হত্যা করা হয় তখনও তিনি সেই দায়িত্বই পালন করছিলেন।
গ্রসের মতে, ফেডারেল অফিসাররা গুডকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি যখন তার গাড়িটি ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই এজেন্টরা তার গাড়ির কাছে আসেন এবং গাড়িটি সরে যাওয়ার সময় একজন অফিসার গুলি চালিয়ে দেন।
নোয়েমের সেই দাবিকে গ্রস বিতর্কিত বা মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন যেখানে বলা হয়েছিল যে গুড সারাদিন এজেন্টদের 'পিছু নিয়েছেন এবং তাদের কাজে বাধা দিয়েছেন'।
গ্রস বলেন, 'প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের কোনো যৌক্তিকতা সেখানে ছিল না। মানুষ কেবল পুলিশি কার্যক্রম ভিডিও করার ক্ষেত্রে তাদের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধিকার প্রয়োগ করছিল।'
বুধবারের গোলাগুলিতে জড়িত এজেন্টের পরিচয় সম্পর্কে করা প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি ডিএইচএস।
তবে ভ্যান্স বলেছেন যে, এই একই এজেন্টকে গত বছর একটি গাড়ি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং তিনি এমন আঘাত পেয়েছিলেন যার জন্য ৩৩টি সেলাই লেগেছিল। এই বিবরণটি ২০২৫ সালের জুন মাসের একটি ঘটনার সাথে মিলে যায়, যখন মিনেসোটার ব্লুমিংটনে একজন অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করার সময় তিনি গাড়ি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং একজন অফিসারকে প্রায় ১০০ গজ (৯১.৪ মিটার) টেনে নিয়ে যান।
অফিসারটিকে আদালতের নথিতে জনাথন রস হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের মতে, তার বাহু ও হাতে চোট লেগেছিল, যা সারাতে মোট ৩৩টি সেলাই প্রয়োজন হয়েছিল। সেই গাড়িচালককে গত মাসে ফেডারেল কর্মকর্তার উপর হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এই গুলি চালানোর ঘটনাটি পুরো শহরকে অস্থির করে তুলেছে এবং হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকালে শত শত বিক্ষোভকারী একটি ফেডারেল ভবনের সামনে জড়ো হয় যেখানে একটি ইমিগ্রেশন কোর্ট অবস্থিত। সেখানে তারা সশস্ত্র ও মুখোশধারী ফেডারেল অফিসারদের লক্ষ্য করে 'লজ্জা' এবং 'খুনি' বলে স্লোগান দেয়; জবাবে কিছু অফিসার বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস এবং পেপার বল ব্যবহার করেন।
নিউইয়র্ক, শিকাগো, সিয়াটল, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ফিলাডেলফিয়াসহ অন্যান্য শহরগুলোতেও বিক্ষোভ চলছিল অথবা বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
গভর্নর ওয়ালজ রাজ্যের ন্যাশনাল গার্ডকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছেন এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার মিনিয়াপোলিসের সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।
স্কুল বন্ধ থাকায় ১৭ বছর বয়সী অ্যাডি ফ্লেওয়েলিং বৃহস্পতিবার মিনিয়াপোলিসের বিক্ষোভে যোগ দেন। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান এবং চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে তার হাই স্কুলে হওয়া একটি রেইড বা অভিযানসহ সামগ্রিক অভিবাসন বিরোধী কঠোর অভিযানের প্রতিবাদ করেন।
তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি এখন স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছি।'
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, গুড মূলত কলোরাডোর বাসিন্দা ছিলেন এবং তার ১৫ বছর বয়সী এক মেয়ে এবং ১২ ও ৬ বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছে। তিনি ২০২০ সালে ভার্জিনিয়ার ওল্ড ডমিনিয়ন ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে ডিগ্রি অর্জন করেন, যেখানে তিনি স্নাতক পর্যায়ে কবিতার জন্য একটি পুরস্কার জিতেছিলেন।
মিনেসোটার এই অভিযানটি ছিল অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের দেশব্যাপী কঠোর ব্যবস্থার অংশ। এছাড়া সোমালি সম্প্রদায়ের কিছু মিনেসোটাভিত্তিক অলাভজনক সংস্থার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে চলা একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযানটি চালানো হয়েছিল। ট্রাম্প মিনেসোটার সোমালি এবং সোমালি-আমেরিকানদের 'আবর্জনা' বলে আক্রমণ করেছিলেন।
