সুষ্ঠু নির্বাচন ও কূটনীতিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার বদ্ধপরিকর: পররাষ্ট্রসচিব
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি নির্বাচনকালীন এবং পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক গোষ্ঠীসহ দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী এবং অংশীজনদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম।
গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৩০০ আসনে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, 'গত বছরের অভ্যুত্থানের চেতনায় একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য এটি আমাদের জনগণের কাছে এক ঐতিহাসিক সুযোগ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি 'জুলাই জাতীয় সনদ' এবং সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত অক্টোবরে জাতীয় কাউন্সিল কমিশন এবং অন্তত ২৫টি রাজনৈতিক দল কর্তৃক এই সনদ গৃহীত হওয়ার পর গণভোটের ফলাফল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিন্যাসে পরিবর্তন এনেছে জানিয়ে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, 'বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠাতে স্বাগত জানায়। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও বিদেশি গণমাধ্যমের জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ আমাদের অনেক বন্ধু ও অংশীদার আসন্ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর মাধ্যমে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।'
কূটনৈতিকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আসাদ আলম সিয়াম বলেন, 'নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে অন্তর্বর্তী সরকার দেশব্যাপী নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
কিছু কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, 'সরকার আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী কূটনৈতিক মিশন ও তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা রক্ষায় পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশে সকল কূটনৈতিক মিশন ও পোস্টের নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ভয়ভীতিহীনভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।'
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, 'কূটনৈতিক এলাকার চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিশেষায়িত কূটনৈতিক নিরাপত্তা ইউনিট সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। অতীতেও আপনারা দেখেছেন, বিক্ষোভকারীদের কূটনৈতিক প্রাঙ্গণের কাছাকাছি যাওয়া থেকে কার্যকরভাবে বিরত রাখা হয়েছে।'
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, 'সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা স্থানীয় পর্যায়ের। এগুলো জননিরাপত্তা বা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর কোনো পদ্ধতিগত ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় না। কূটনৈতিক গোষ্ঠীদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা অবনতির কোনো আশঙ্কা নেই।'
এর আগে, গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি জানান, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে, গত সপ্তাহে পুরোনো পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪, ২০১৮ ও ২০১৪ সালের মতো বিতর্কিত নির্বাচনের বিপরীতে একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও আস্থাভাজন নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা সতর্কতা
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। গত ১৫ ডিসেম্বর জারি করা ওই নোটিশে বলা হয়, 'বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভের মাত্রা বাড়তে পারে।'
দূতাবাস সতর্ক করে বলেছে, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও তা দ্রুত সহিংস রূপ নিতে পারে। মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার, স্থানীয় গণমাধ্যমে চোখ রাখার এবং ভিড় ও বিক্ষোভ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের উদ্বেগ ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য
নির্বাচন নিয়ে ভারতের পরামর্শ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গত বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'বিগত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে ভারত কখনোই কোনো প্রশ্ন তোলেনি, তাই আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভারতের পরামর্শ বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না।'
এদিকে, বুধবার (১৭ ডিসেম্বর ২০২৫) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'বাংলাদেশে নিরাপত্তার পরিবেশের অবনতি এবং বিশেষ করে ঢাকায় ভারতীয় মিশনের চারপাশে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার লক্ষে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পরিকল্পনায় ভারত তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নিয়ে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো যে মিথ্যা বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করছে, ভারত তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনার বিষয়ে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত করেনি বা ভারতের সঙ্গে অর্থবহ কোনো প্রমাণ শেয়ার করেনি।'
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে এবং সর্বদা একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে আসছে। ভারত আশা করে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনে বাংলাদেশে ভারতীয় মিশন ও পোস্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
