প্রাচীন মিশরের ডুবে যাওয়া বন্দর আবিষ্কার, ক্লিওপেট্রার সময়ের?
মিশরের উপকূলে ভূমধ্যসাগরের গভীরে এমন একটা জিনিস আবিষ্কার হয়েছে, যা নিয়ে প্রত্নতত্ত্বের দুনিয়ায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন ডুবে যাওয়া এক আস্ত বন্দর! একই সাথে এটিকে রানী ক্লিওপেট্রার গোপন সমাধি খুঁজে পাওয়ার পথের প্রথম ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন তারা।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অভিযাত্রী ক্যাথলিন মার্টিনেজ ও বব ব্যালার্ডের মতো অভিজ্ঞ ডুবুরিদের একটি দল সাগরের গভীরে যা দেখেছেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য! সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বিশাল বিশাল স্তম্ভ। একেকটির উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। শুধু তাই নয়, পাওয়া গেছে ঝকঝকে পালিশ করা পাথরের মেঝে, সিমেন্টে গাঁথা ব্লক, জাহাজের পুরনো নোঙর আর 'অ্যাম্ফোরা' নামের লম্বা মাটির জার। সবচেয়ে উত্তেজনার বিষয় হলো, সবকিছুর বয়স নির্ণয় করে দেখা গেছে, এগুলো সেই ক্লিওপেট্রার আমলের!
কিন্তু তারা এই গুপ্তধনের খোঁজ পেলেন কীভাবে? আসলে এর পেছনে রয়েছে ৪ হাজার ২৮১ ফুট লম্বা এক রহস্যময় সুড়ঙ্গ, যা আলেকজান্দ্রিয়ার কাছের তাপোসিরিস ম্যাগনা মন্দির থেকে সোজা সমুদ্রের দিকে চলে গেছে। সেই সুড়ঙ্গের পথ ধরেই এই সাগরতলের রাজ্যে পৌঁছেছেন গবেষকেরা।
মার্টিনেজ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ক্লিওপেট্রার সমাধির রহস্য ভেদ করার চাবিকাঠি এই তাপোসিরিস ম্যাগনাতেই লুকিয়ে আছে। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ তার এই তত্ত্বের সঙ্গে একমত নন।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা ঘোষণা হতেই হইচই পড়ে যায়। স্বয়ং টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া কিংবদন্তি সমুদ্রবিজ্ঞানী বব ব্যালার্ডের মুখেই বিস্ময়! তিনি বলেন, 'আমি ৫০ বছর ধরে সাগর চষে বেড়াচ্ছি। জলের নিচে কত কী দেখেছি! কিন্তু এমন জিনিস আমি জীবনেও দেখিনি। এটা যে মানুষের হাতেই তৈরি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।'
গত ২০ বছর ধরে ক্লিওপেট্রার সমাধির জন্য জীবনপাত করছেন মার্টিনেজ। তিনি মনে করেন, এই আবিষ্কার তাকে লক্ষ্যের অনেক কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তার কথায়, 'ক্লিওপেট্রার সমাধির আবিষ্কার হবে এই শতাব্দীর সেরা আবিষ্কারগুলোর একটি।'
ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর সেই অমীমাংসিত রহস্য
মাত্র ৩৯ বছরের জীবনেই প্রাচীন বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ক্লিওপেট্রা। তিনি ছিলেন মিশরের শেষ ফারাও। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে রোমানদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। কথিত আছে, শত্রুর হাতে ধরা না দিয়ে তিনি বিষাক্ত সাপের ছোবলে আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু সত্যিটা কী, তা আজও ধোঁয়াশায় ঢাকা।
মার্টিনেজের তত্ত্ব হলো, মৃত্যুর পর ক্লিওপেট্রার মরদেহ গোপনে তাপোসিরিস মাগনাতে নিয়ে আসা হয়। তারপর সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে এই বন্দরে এনে কোনো এক গোপন স্থানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
২০০৪ সাল থেকে এই জায়গায় খননকাজ চালাচ্ছেন মার্টিনেজ। ২০০৫ সালে তিনি একটি নীল কাঁচের টুকরো খুঁজে পান, যাতে লেখা ছিল মন্দিরটি দেবী আইসিসের। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই মেলে ক্লিওপেট্রার মুখ ছাপ দেওয়া শয়ে শয়ে মুদ্রা! ঠিক যেন গুপ্তধনের প্রথম সঙ্কেত!
খননকাজে এখনও পর্যন্ত ৩৩৭টি মুদ্রা, নানা ধরনের মাটির পাত্র, মূর্তি এবং অলঙ্কার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি নারীমূর্তি পেয়ে মার্টিনেজের ধারণা, এটাই ক্লিওপেট্রার মূর্তি! যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূর্তির মুখের সঙ্গে ক্লিওপেট্রার ছবির মিল নেই।
মার্টিনেজ এখন জলের তলার এই জগৎ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আরও গভীরে যেতে চান। তিনি নিশ্চিত, ক্লিওপেট্রা এবং তার প্রেমিক মার্ক অ্যান্টনির সমাধি খুঁজে পাওয়াটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
তবে সব বিশেষজ্ঞ কিন্তু এত আশাবাদী নন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল কার্টলেজের মতে, 'ক্লিওপেট্রাকে আলেকজান্দ্রিয়ার রাজকীয় কবরস্থানেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল।' তিনি মনে করিয়ে দেন, 'দুর্ভাগ্যবশত, ভূমিকম্প আর সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় আলেকজান্দ্রিয়ার সেই অংশটি এখন চিরতরে জলের তলায়। সেই সমাধি খুঁজে বের করা এককথায় অসম্ভব।'
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড: জেন ড্রেকটও বলছেন, এখন পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ায় কোনো শাসকের সমাধিই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার কথায়, 'যদি মার্টিনেজ সত্যিই ক্লিওপেট্রার সমাধি খুঁজে পান এবং তার অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেন, তবে তা এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার হবে।'
অনুবাদ : নাফিসা ইসলাম মেঘা
