চীনা যন্ত্রাংশ দিয়ে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে হুথিরা, বাড়ছে হামলার ব্যাপ্তি
যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা 'কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ''এর নতুন তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক 'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'। মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা চীনা কোম্পানি থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরানের তৈরি 'খেবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করছে। ইরানি এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁত নিশানায় লক্ষ্যভেদে সক্ষম।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির সর্বোচ্চ পাল্লা বা রেঞ্জ হবে প্রায় ১,৯০০ কিলোমিটার। এই দূরপাল্লার সক্ষমতার ফলে পুরো সৌদি আরব এবং ইসরায়েল সরাসরি হুথিদের হামলার আওতায় চলে আসবে।
হুথি বিদ্রোহীদের ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু, এরপরেও হুথিরা ইয়েমেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই গোষ্ঠী ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরুর পর থেকে মূলত মার্কিন-ইরান যুদ্ধের আঞ্চলিক বিস্তার বা 'স্পিলওভার' হিসেবে ইয়েমেন সংঘাত নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান অবশ্য সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে রোববার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন। পরে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ২০২৫ সালে দুটি সুনির্দিষ্ট চালানের গোপন মালামাল জব্দ করার পর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে 'কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ' তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সাধারণ নানা বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সরঞ্জাম গোপনে আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছিল।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্টজ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, "এ ধরনের যন্ত্রাংশ আমদানির অর্থ হতে পারে যে তারা (হুথিরা) ইতোমধ্যেই উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে, কিংবা এর চেষ্টা চালাচ্ছে, যা হয়তো এখনও পুরোপুরি সফল হয়নি।" তিনি আরও যোগ করেন, হুথিদের অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ছদ্মবেশে (ক্যামোফ্লেজ) রাখা হয়েছে; ফলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কতদূর এগিয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।
অস্ত্র বিক্রির নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার দাবি চীনের
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য মতে, চীন সরকার দাবি করেছে যে তারা হুথিদের ওপর আরোপিত জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণরূপে মেনে চলছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হুথিদের আমদানিকৃত কিছু উপকরণের বেসামরিক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, বেশ কিছু সরঞ্জাম কেবল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল।
আমদানিকৃত এসব উপকরণের মধ্যে ছিল কাস্টম-মেড ধাতব ক্ষেপণাস্ত্র যন্ত্রাংশ—যার মধ্যে ইঞ্জিনের কিছু অংশ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মূল কাঠামো (এয়ারফ্রেম)-এর উপাদান অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ উড্ডয়নকালে ক্ষেপণাস্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী 'ফিন' বা ডানা এবং খেবার শেকান সিরিজের সলিড-প্রোপেল্যান্ট রকেট মোটরের কিছু অংশও উদ্ধার করেছে।
এছাড়া ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ কিছু বিশেষ যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার সরঞ্জাম এবং কাঁচামাল জব্দ করেছে। এসব কাঁচামালের মধ্যে ছিল 'অ্যাবলেটিভ মেটেরিয়াল'—যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও গতিলাভের সময় তৈরি হওয়া তীব্র তাপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন অংশকে রক্ষা করে।
ইরানি 'খেবার শেকান' ক্ষেপণাস্ত্র কেন বিশেষভাবে সুবিধাজনক?
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে গত জুলাইয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালাতে ইরান মূলত 'খেবার শেকান' নামক সাশ্রয়ী, সহজে স্থানান্তরযোগ্য এবং নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যার পাল্লা কমপক্ষে ১,৪০০ কিলোমিটার।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন জ্বালানি চালিত (সলিড-ফুয়েল) মধ্যম পাল্লার খেবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের পুরোনো মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে উৎক্ষেপণের ঠিক আগে জ্বালানি ভরতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতো; অন্যদিকে খেবার শেকানে আগে থেকেই জ্বালানি ভরা থাকে এবং এগুলো দ্রুত ট্রাক বা অন্যান্য যানে লোড করে সরাসরি উৎক্ষেপণ করা যায়। ফলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে ওত পেতে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলোর নজর এড়িয়ে দ্রুত আঘাত হানা অনেক সহজ হয়ে যায়।
