নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পকে সঙ্গে নিতে অনীহা রিপাবলিকানদের, ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যে লড়াইগুলো তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে, সেগুলোতে লড়াই করা রিপাবলিকান প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে খুব একটা আগ্রহী নন—তা এখন পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
গত মাসে ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন সংক্রান্ত সম্মেলনে তাদের খুব কম সংখ্যকই উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকে তার সফরের তালিকায় আশ্চর্যজনকভাবে আলাবামা, ওকলাহোমা এবং নিউইয়র্কের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলো প্রাধান্য পেয়েছে, আর সত্যিকারের মূল ক্ষেত্রগুলোর মাত্র কয়েকটি জায়গা স্থান পেয়েছে।
এমনকি টেক্সাসেও গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ট্রাম্পের আসন্ন জনসভা এড়িয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতির এই গতিপ্রকৃতি নিয়ে ট্রাম্পকে দিন দিন বেশ সংবেদনশীল মনে হচ্ছে—যা স্বাভাবিকও বটে। কারণ নিজের নিম্ন জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, আর চার সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে একমাত্র তিনিই তার দলকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারেন—এমন ধারণার ওপর ভর করে বসে আছেন তিনি।
মঙ্গলবার তিনি তার জনসভাগুলো নিয়ে বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং অন্তত পাঁচবার আলাদাভাবে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
বাল্টিমোরে একটি অরাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'যাইহোক, আমি ঘুরে ঘুরে জনসভা করছি। রিপাবলিকান পার্টির জনপ্রিয়তা এবার আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে।' তিনি আরও বলেন, 'আজকে কেউ একজন বলল, 'আমার বিস্ময় জাগে, এমনটা কেন হচ্ছে?' ঠিক আছে, আমি নেমেছি — আমাকে তো বের হতেই হতো। কাজটা আমাকেই করতে হতো।'
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন তার "জনসভার ভিড় এবং মানুষের উৎসাহ অবিশ্বাস্য!" তিনি আরও বলেন, 'আমরা সব জায়গার নির্বাচনী লড়াইগুলোর হিসাব-নিকাশ বদলে দিচ্ছি... সবকিছু ঘটছে!'
অন্য আরেকটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'আমার জনসভাগুলো আবারও রিপাবলিকান পার্টিকে রক্ষা করছে!' সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করা সত্ত্বেও তিনি বারবার এই প্রসঙ্গে ফিরে আসেন। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, জনসভাগুলো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে।
টেক্সাস সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের একটি ফাঁস হওয়া অডিও (যেখানে প্যাক্সটনকে বলতে শোনা যায় ওয়াশিংটন ডিসি তার প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ করছে)— বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প উত্তর দেন, কয়েক দিন আগে তিনি জনসভা শুরু করার পর থেকে প্যাক্সটন "অনেক ভালো করছেন"।
সোমবার যখন এক সাংবাদিক মিশিগানে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর বিষয়ে জানতে চান, তখন ট্রাম্প জানান তিনি সেখানে যাবেন। আবার মেইনে প্রচারণায় নামার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইঙ্গিত দেন যে তিনি সেখানেও যাবেন।
ট্রাম্প বলেন, 'মেইনের বিষয়ে আমি ঠিক নিশ্চিত নই। তবে আমার মনে হয় আমরা মেইনেও যাচ্ছি।' কিন্তু রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বারবার বলে আসছেন—যার মধ্যে মঙ্গলবার রাতের এক বিতর্ক সভাও রয়েছে—যে তিনি আশা করেন না ট্রাম্প মেইনে আসবেন। গত জুনে কলিন্স বলেছিলেন, 'এমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনাই নেই।'
আইওয়াতেও এটি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিনিধি পরিষদের তিনজন রিপাবলিকান সদস্য সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। এছাড়া সিনেট প্রার্থী প্রতিনিধি অ্যাশলে হিনসনও ট্রাম্পের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে।
গত সপ্তাহে এই আইন প্রণেতারা হোয়াইট হাউসের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিলে, ট্রাম্প তার সাথে আরও বেশি নির্বাচনী প্রচার কর্মসূচির পরিকল্পনা উত্থাপন করে তাদের একপ্রকার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে ফেলে দেন।
ট্রাম্প বলেন, 'আমি আইওয়াতে যাব।' তিনি আরও বলেন, 'আমি বলতে পারি যে আমরা একটা দারুণ জনসভা করতে যাচ্ছি, এবং আমরা সবাই সেখানে একসাথে থাকব। আপনাদের সবাইকে আমাদের বিজয়ী করে আনতে হবে।'
আর গত সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে, যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অংশ নেওয়া অনেক রিপাবলিকান প্রার্থীই প্রেসিডেন্টের ট্রাম্প-কেন্দ্রিক মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্মেলনটি এড়িয়ে চলছেন, তখন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন যে এর পেছনে ইতিহাস গড়া তার নিম্ন জনপ্রিয়তার রেটিং ছাড়া অন্য কারণ রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, 'সবাই আসতে চায়।' তিনি আরও বলেন 'কিছু লোক না আসার কারণ হলো আমাদের কাছে ৫০০ জন রাজনীতিককে বসানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না।'
তিনি সে সময় আরও বলেছিলেন তিনি সারা দেশজুড়ে চষে বেড়াবেন এবং সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে প্রতিটি রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাবেন। ২ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন, 'আমি সেই ৩৫টি জায়গার প্রতিটিতেই যাব এবং আমরা দেখব সবাইকে বিজয়ী করে আনা যায় কি না।' এক সপ্তাহ পর সম্মেলনে তিনি একই দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, 'আমি তাদের প্রতিটিতেই যাব, প্রায় ৩৫টি জায়গায়। কয়েকটি ক্ষেত্রে আমি দু'বার করে যাব।'
কিন্তু বর্তমানে তা আর ঘটছে বলে মনে হচ্ছে না—কমপক্ষে এখন পর্যন্ত তো নয়ই। নির্বাচনের চার সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে ট্রাম্প আসল যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত অঞ্চলগুলোর মাত্র কয়েকটিতে সফর করেছেন।
আর তিনি নিজের জন্য যতই প্রভাবশালী বা সম্পদ হওয়ার দাবি জানান না কেন, মনে হচ্ছে তার সেই 'ট্রাম্প-এ-পালুজা' মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনটি উল্টো রিপাবলিকানদের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে, ঠিক সেই সময়টাতেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম মূল মাপকাঠি 'জেনারিক ব্যালট'-এর চিত্র ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মোড় নিতে শুরু করে।
রিপাবলিকানরা তার সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে চায় না এবং তিনি তাদের জন্য এক রাজনৈতিক বোঝা—এমন ধারণা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়।
উত্তাল ও বিশাল জনসভাগুলোতে নিজের সমর্থকদের চাঙ্গা করার ক্ষমতা বরাবরই তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। অথচ আজ তাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে অনেক রিপাবলিকান নেতা এই সভাগুলোকে উপকারের চেয়ে ক্ষতিকর বলেই মনে করছেন।
তার সাথে প্রচারণায় নামার জন্য রিপাবলিকানদের এই আগ্রহের অভাব কিন্তু নিজের দলের ওপর তার সেই একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছে, যা তিনি এক দশক ধরে গড়ে তুলেছেন এবং যা তার অবশিষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখার মূল ভিত্তি। তিনি যদি সত্যিই তার সমর্থকগোষ্ঠী এবং রিপাবলিকানদের নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চালনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তবে তার হাতে আর বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
