ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণায় ট্রাম্প শিবিরের উল্লাস, বিস্তারিত জানতে চান ডেমোক্র্যাটরা
যুদ্ধ অবসানে একটি প্রাথমিক চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের উপস্থিতিতে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই সমঝোতা স্মারক সই হবে। এই চুক্তিকে নিজেদের 'কৌশলগত বিজয়' হিসেবে অভিহিত করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা। যদিও এই চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তগুলো এখনো প্রকাশ করা হয়নি।。
শুক্রবার সই হতে যাওয়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) কী কী প্রতিশ্রুতি থাকছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো চুক্তি স্বাক্ষরের পরই কেবল আলোচনার জন্য উন্মুক্ত করা হবে কি না—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও গত রোববার থেকেই সমর্থকদের প্রশংসায় ভাসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
প্রাথমিক চুক্তি ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্যে এক 'নতুন যুগের' সূচনা হতে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
ফক্স নিউজকে জেডি ভ্যান্স বলেন, "প্রেসিডেন্ট যা করেছেন, তা ওই অঞ্চলের খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো একটি বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি করেছে।" তিনি আরও বলেন, "আমি মনে করি আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।"
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তি ঘোষণার বিষয়টিকে গত রোববার ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিনের সঙ্গে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, "এমন অবিশ্বাস্য সাহস, অসাধারণ শক্তি, অনন্য রসবোধ এবং দেশের প্রতি অতুলনীয় ভালোবাসা রয়েছে—আমেরিকা এমন একজন নেতা পেয়ে সত্যিই ভাগ্যবান।"
আরও বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পকে 'প্রধান চুক্তি-নির্মাতা' (ডিল-মেকার ইন চিফ) বলে প্রশংসা করেছেন।
কংগ্রেস সদস্য রবার্ট অ্যাডারহোল্ট ট্রাম্পের দাবির সুরেই বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আসন্ন চুক্তিটি ২০১৫ সালের 'জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন' (জেসিপিওএ)-এর তুলনায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর অনেক বেশি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করবে।
উভয় পক্ষই জানিয়েছে, প্রাথমিক এই চুক্তির ফলে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই বন্ধ হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ 'এক্সে' এই চুক্তির কথা জানানোর পর ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি আসে।
শাহবাজ লিখেছেন, "ব্যাপক আলোচনার পর আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মধ্যে শান্তি চুক্তি অর্জিত হয়েছে। উভয় পক্ষই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।"
যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ইরানের কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল পুনরায় শুরু হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা গত কয়েক দিন ধরে বলছেন যে, এই প্রাথমিক চুক্তিটি কেবল একটি শুরুর বিন্দু মাত্র। এর পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল সমস্যাগুলো নিয়ে আরও ৬০ দিন ধরে আলোচনা চলবে। তারপরেই হবে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কবে থেকে ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদ (ফ্রিজড অ্যাসেট) ছেড়ে দেবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার শুরু করবে—সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে নেওয়া হবে না, বরং চুক্তি সইয়ের পর নির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ সাপেক্ষেই কেবল এগুলো কার্যকর করা হবে।
মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন, তিনিও গত রোববার এই আপাত সফলতায় আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
তবে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের বার্তার মধ্যে অমিল বা ভিন্নতার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, "আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন যে, চুক্তিটি নিয়ে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন মধ্যস্থতাকারী দলের দাবির চেয়ে আলাদা বলে মনে হচ্ছে।"
স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি ডেমোক্র্যাটদের
এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করা মার্কিন স্বার্থকে কতটা রক্ষা করেছে, তা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই প্রশ্ন তুলে আসছেন ডেমোক্র্যাটরা।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে জানিয়েছিল যে, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা।
ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তারা আরও বলেছিলেন যে, তাঁরা এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) আশা করছেন। তবে তেমন কিছু ঘটেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং আরও ডজনখানেক কর্মকর্তাকে হত্যা করা সত্ত্বেও—দেশটির কট্টরপন্থী সরকার এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আরও বেশি সুসংহত ও শক্তিশালী হয়েছে। খামেনিের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়ে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
গত শনিবার 'এনএস নাও'-এর সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন কংগ্রেস প্রতিনিধি সেথ মল্টন এই সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলোর তীব্র সমালোচনা করে একে "মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে একটি আত্মসমর্পণ দলিল" বলে অভিহিত করেছেন।
মল্টন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে মার্কিন করদাতাদের ১০ হাজার কোটি (১০০ বিলিয়ন) ডলার খরচ হয়েছে, ১৪ জন মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। আর তার বিনিময়ে আমরা এমন এক চুক্তি পেলাম যা কেবল সেই নৌপথটিকে পুনরায় সচল করবে, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এমনিতেই উন্মুক্ত ছিল? একে কীভাবে জয় বলা যায়?"
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস গত রোববার বলেছেন, ট্রাম্পের এই "খামখেয়ালির যুদ্ধটি ছিল ভুল পথে চালিত এবং এটি মার্কিন স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর"।
তা সত্ত্বেও কূটনীতির ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে এই চুক্তির ব্যাপারে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি তুলেছেন তিনি।
একবিবৃতিতে গ্রেগরি মিকস বলেন, "আমেরিকার জনগণ কেবল অস্পষ্ট ঘোষণা বা রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ পাওয়ার যোগ্য নয়।" তিনি আরও বলেন, "তারা নিরাপত্তা, স্পষ্ট উত্তর এবং এই নিশ্চয়তা পাওয়ার দাবি রাখে যে, বর্তমান প্রশাসন এমন কোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না যা আমাদের এই অনুমোদনহীন এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।"
