শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, ২ হাজার স্কুল বন্ধ, যোগ দিয়েছেন শিক্ষক-শ্রমিকেরাও
শিক্ষাবাজেটে ঘাটতি, শিক্ষক ও কর্মী সংকট এবং পুরোনো ভবনের শিক্ষাদানের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশটির রাজধানী প্যারিসের একটি শহরের হাইস্কুলে বিক্ষোভরত শিক্ষকদের সমর্থনে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
ক্লাস বয়কট করে দেশটির বিভিন্ন শহরের হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশি বলপ্রয়োগ, জলকামান ব্যবহার এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনায় ফ্রান্সে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দুই সপ্তাহ ধরে চলা এ বিক্ষোভ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ, যার ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান আয়োজক মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন জানিয়েছে, ফ্রান্সজুড়ে ২ হাজার হাইস্কুল বন্ধ রয়েছে।
ইউনিয়ন সিঁদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) আরও জানিয়েছে, দেশজুড়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা আন্দোলন 'সংগঠিত করেছে'।
তবে স্কুল বন্ধের বিষয়ে ইউনিয়নের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ফারাক রয়েছে।
দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছিল, ৮৯১টি স্কুলে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ রয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্যারিস বাদেও সারা দেশে প্রায় ৮৬ হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমেছেন।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরাও যোগ দিয়েছেন।
ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ হলেও উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের রেনে শহরে একটি বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষের মধ্যে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এ সময় কয়েকজন মানুষকে ছাতা দিয়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
এছাড়া মার্সেইয়ে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে, এতে বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দিনভর হাজারো বিক্ষোভকারী এই শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। তারা কিছু সময়ের জন্য থেমে স্লোগান দিয়েছেন, এরপর আবার এগিয়ে গেছেন। এ সময় পুলিশও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
তাছাড়া প্যারিসেও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।
এদিকে, এদিন প্যারিসের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যোগ দেন বামপন্থী নেতা-লুক মেলঁশোঁ।
তার উপস্থিতিতে বিক্ষোভরত জনতার মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা 'মেলঁশোঁ প্রেসিডেন্ট!' বলে স্লোগানও দেন।
তিনি ফ্রান্স আনবোওড (এলএফআই) দলের প্রবীণ নেতা। তরুণ বামপন্থী সমর্থকদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
তিনি নানা বিক্ষোভস্থলে গিয়েছেন এবং তাকে একনজর দেখতে মানুষের ভিড় জমে যায়।বর্তমানে জনমত জরিপভেদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির জোরালো সমর্থক। এ কারণেই শিক্ষার্থীরা তাকে পছন্দ করে। তবে সরকার তার বিরুদ্ধে নির্বাচনি স্বার্থে অশান্তি উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু বলেছেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দেশজুড়ে শত শত পুলিশ কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
আজ বিকেলে ফরাসি পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় লেকর্নু বলেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ২১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৮৫ জন স্কুলকর্মী এবং ৭১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
সহিংসতাকে 'স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখানোর' প্রবণতার নিন্দা করে তিনি বলেন, এটি 'গ্রহণযোগ্য নয়'।
তিনি বলেন, 'কোনো হাইস্কুল পুড়িয়ে দেশের হাইস্কুল ভবনগুলোর অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। একজন শিক্ষককে গণপিটুনি দিলে শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে কোনো সহায়তা হয় না।'
তিনি আরও বলেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে 'পুলিশি দমন-পীড়নের' নির্দেশ দিয়েছে—এমন দাবি পুরোপুরি 'মিথ্যা'।
এর আগে, গতকাল সোমবার উত্তর ফ্রান্সে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময় এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, স্ট্রাসবার্গ, ট্যুরস ও লিলের মতো শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
