বাড়ির ‘অন্ধকার কোণ’ থেকে নিলামের মঞ্চে: ৩০ ডলারে কেনা চিত্রকর্ম বিক্রি হলো ১.৩৫ মিলিয়ন ডলারে
যুক্তরাষ্ট্রের একটি পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রির আসর (এস্টেট সেল) থেকে মাত্র ৩০ ডলারে কেনা একটি তৈলচিত্র নিলামে বিক্রি হয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ডলারে। নিলামে তোলার আগে নিশ্চিত হওয়া যায়, রহস্যময় এই শিল্পকর্মটি আসলে প্রখ্যাত পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী গার্ট্রুড এবারক্রম্বির আঁকা।
নিলাম সংস্থা ফ্রিম্যানসের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে মিশিগানের একটি বাড়ির অন্ধকার কোণ থেকে ৮ বাই ১১ ইঞ্চির এই 'স্টিল-লাইফ' তৈলচিত্রটি উদ্ধার করা হয়। চলতি মাসে এটি নিলামে তোলা হয়। একজন শিল্প-বিশেষজ্ঞ এটিকে এবারক্রম্বির আঁকা 'অল্ডারম্যান মেরিয়ামস সেলস' হিসেবে শনাক্ত করেছেন। প্রায় ৭৫ বছর ধরে তৈলচিত্রটি সর্বসাধারণের চোখের আড়ালে ছিল।
১৯৫১ সালে আঁকা এই চিত্রকর্মে ১০টি ঝিনুক বা শামুকের খোলস দেখা যায়। আমেরিকার শিল্পাঙ্গনে 'বোহেমিয়ান কুইন' নামে পরিচিত এবারক্রম্বির তুলিতে এই উপাদানটি প্রায়ই উঠে আসত। পরবর্তী দুই বছরে শিল্পীর ছয়টি একক প্রদর্শনীতে তৈলচিত্রটি প্রদর্শিত হয়েছিল এবং তখন এর দাম ধরা হয়েছিল ৫০ থেকে ১৫০ ডলারের মধ্যে।
তবে শিল্পী এটি কখনো বিক্রি করেননি। চিকিৎসার ফি পরিশোধের বিনিময়ে মিশিগানের কালামাজুর এক চিকিৎসককে তিনি এটি উপহার দেন। চিকিৎসকের মৃত্যুর পর তার পারিবারিক সম্পত্তির অংশ হিসেবে এটি সংরক্ষিত ছিল এবং সবশেষে গত জুলাইয়ে বাড়ির উত্তরাধিকার সম্পত্তি বিক্রির তালিকায় চলে আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৌভাগ্যবান ক্রেতাকে 'পুরোনো রেকর্ড অ্যালবাম এবং মধ্য শতকের আসবাবের দীর্ঘদিনের সংগ্রাহক' হিসেবে বর্ণনা করেছে নিলাম সংস্থাটি। ফ্রিম্যানস জানায়, গ্যারেজে যাওয়ার একটি করিডোরের অন্ধকার কোণে তৈলচিত্রটি অযত্নে পড়ে ছিল। সেদিন বাকি সব ক্রেতার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল এটি।
তৈলচিত্রটির অন্ধকার পটভূমিতে অস্পষ্টভাবে 'এবারক্রম্বি, '৫১' স্বাক্ষরটি দেখতে পেয়ে ক্রেতা মাত্র ৩০ ডলারের ঝুঁকি নিয়ে এটি কিনে নেন। এরপর তিনি পরিবারের সঙ্গে অবকাশকালীন ভ্রমণের পথ কিছুটা পরিবর্তন করে মিলওয়াকি আর্ট মিউজিয়ামে যান, যেখানে তখন এবারক্রম্বির একটি প্রদর্শনী চলছিল। সেখানে প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগে ১৯৫২ সালের একটি পুরোনো সংবাদের কাটিংয়ে তৈলচিত্রটির ছবি এবং এতে আঁকা খোলসগুলোর ছবি দেখতে পান তিনি।
এরপর তিনি শিল্পকর্মটি নিয়ে যান ফ্রিম্যানস নিলাম হাউসে, যারা ওই প্রদর্শনীর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিল। রুজভেল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলার ইতিহাসের অধ্যাপক এবং এবারক্রম্বি বিশেষজ্ঞ সুসান ওয়েইনিঙ্গার নিশ্চিত করেন যে এটি আসল শিল্পকর্ম এবং এখনো এর আদি ফ্রেমেই রয়েছে। পরে শিল্পকর্ম সংরক্ষক জুলিয়ান বাউমগার্টনার এটি পরিষ্কার করেন। তিনি তার কাজের ভিডিওতে এটিকে 'নিখুঁত অবস্থায়' থাকা কাজ বলে বর্ণনা করেন, যার ওপর কেবল কিছুটা ময়লা ও বার্নিশের স্তর জমে ছিল।
বাউমগার্টনার বলেন, 'এটি ছিল নিষ্প্রভ ও প্রাণহীন। কিন্তু এখন পরিষ্কার, কিছুটা সংস্কার এবং পুনরায় বার্নিশ করার পর এটি আবার জীবন্ত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।'
ফ্রিম্যানস প্রথমে তৈলচিত্রটির দাম দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে অনুমান করেছিল। তবে গত বৃহস্পতিবারের নিলামে সেই পূর্বাভাস বহু পেছনে ফেলে শিল্পীর কাজের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়ে এটি। এর আগে ২০২৫ সালে সদবি'স-এ এবারক্রম্বির 'মেসেজ ফর মার্সি' শিল্পকর্মটি রেকর্ড ১.০২ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল, যা ছিল ধারণার চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।
স্বশিক্ষিত শিল্পী এবারক্রম্বি ১৯৭৭ সালে মারা যান। পরাবাস্তব ও স্বপ্নময় শিল্পকর্মের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া শিকাগোর হাইড পার্কে নিজের বাড়িতে জ্যাজ সঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পী ডিজি গিলেস্পি ও চার্লি পার্কারদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডার আয়োজন করার জন্যও তিনি বিখ্যাত ছিলেন।
শামুক ও ঝিনুকের খোলস (পাশাপাশি পেঁচা, বিড়াল, রহস্যময় দরজা এবং তাঁর নিজের ভাষায় 'সামান্য অদ্ভুত কিছু সাধারণ বিষয়') ছিল তার শিল্পকর্মের নিয়মিত অনুষঙ্গ। তার আঁকা ফাঁকা চাঁদের আলোয় ঘেরা ল্যান্ডস্কেপ বা ঘন অন্ধকার পটভূমিতে প্রায়ই ফাটল ধরা বা ছিদ্রযুক্ত খোলস দেখা যেত। তার কিছু রহস্যময় চিত্রকর্মে খোলসের পাশে গোপন পতাকা কিংবা ডমিনো দেখা গেছে। আবার ১৯৬৭ সালের 'স্নেইল ওম্যান'-এর মতো কাজে খোলস থেকে কাল্পনিক নারীমূর্তি বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে।
এবারক্রম্বির শিল্পকর্মগুলো ছিল গভীর আত্মজৈবনিক। বিমূর্ত ধারণার চেয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও পরিচয়কেই তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি একবার বলেছিলেন, 'আমি সবসময় নিজেকেই আঁকি।' ফ্রিম্যানসের নিলাম বিবরণী অনুযায়ী, এই খোলসগুলো ছিল মূলত বন্ধুত্বের প্রতীক এবং তিনি সাধারণত তার সবচেয়ে কাছের মানুষদেরই এগুলো উপহার দিতেন।
নিলামের আগে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ফ্রিম্যানসের সিনিয়র সহসভাপতি জ্যাকারি ওয়ারসাম তৈলচিত্রটির পুনরায় খুঁজে পাওয়াকে 'অসাধারণ' বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি মিলওয়াকি প্রদর্শনীর দর্শকদের আগে বলেছিলেন যে কখনো কখনো পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রির আসরগুলোতে এবারক্রম্বির শিল্পকর্ম অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যায়। সেই কথার সূত্র টেনে তিনি বলেন, 'আমি ভাবতেও পারিনি যে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এমন একটি বিরল ঘটনা সত্যি সত্যি ঘটে যাবে।'
