আকস্মিক বন্যা থেকে বাঁচতে চার হিমবাহ হ্রদের পানি সেচার ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নিচ্ছে নেপাল
সম্প্রতি নেপালে বন্যায় ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর পর বন্যার ঝুঁকি কমাতে চলতি অর্থবছরে উঁচুপর্বতের চারটি হিমবাহ হ্রদের পানি নিষ্কাশনের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে নেপাল সরকার। এমন তথ্য জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
গত আগস্টে হিমবাহ ধসের ফলে চীনের সীমান্তসংবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ থাকা ৫ হাজারেরও বেশি মানুষের খোঁজে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
নতুন এই প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ সুবাস তুলাধর বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হলো হ্রদগুলোর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা হ্রাস করা।'
তিনি আরও জানান, নিয়ন্ত্রিত খালের মাধ্যমে হ্রদের পানি পার্শ্ববর্তী নদীগুলোতে প্রবাহিত করা হবে। তবে কাজের সময় আকস্মিক বন্যার বিপদের পাশাপাশি তীব্র উচ্চতায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করার ফলে উদ্ধারকারী ও প্রকৌশলীদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার থুলাগী, লোয়ার বারুন, লুমডিং ছো এবং হোঙ্গু-২ নামক চারটি হ্রদকে চিহ্নিত করে প্রাথমিক নকশা এবং বিস্তারিত সমীক্ষার কাজ ২০০৭ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি শেষ হওয়া অর্থবছরের মধ্যেই শুরু হবে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' (ইসিমোড)-এর ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,০৫০ মিটার থেকে ৫,৪৮৩ মিটার (১৩,২৮০ ফুট থেকে ১৮,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত এই জলাশয়গুলোকে দেশটির অন্যতম বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নেপালের 'সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চ'-এর সুবাস তুলাধর জানান, প্রায় ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয়ের এই বিশাল উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা নেপালের রয়েছে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, ইউএনডিপি এবং নেপাল সরকারের যৌথ অর্থায়নে এই প্রকল্প পরিচালিত হবে।
পানি নিষ্কাশন উদ্যোগে লাগতে পারে ৬ বছর
সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক সঞ্জীব বারাল জানান, বিস্তারিত পর্যালোচনার পরই কেবল গেট বিশিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের মূল কাজ শুরু হবে, যা সম্পন্ন করতে প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
এই পরিকল্পনার আওতায় হ্রদগুলোতে মনিটরিং সেন্সর স্থাপন, বন্যা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা এবং পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে থাকা নিম্নাঞ্চলের অধিবাসীদের প্রস্তুত রাখতে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নেপাল এর আগেও এ ধরনের প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। ২০০০ সালে তারা মধ্য হিমালয়ের 'শো রোলপা' হিমবাহ হ্রদের পানি ৩ মিটার (১০ ফুট) এবং এক দশক আগে এভারেস্টের নিকটবর্তী 'ইমজা' হ্রদের পানি সফলভাবে কমিয়েছিল।
সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর বাড়ছে তৎপরতা
নেপালের বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতি নিয়ে গত মাসে জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক বার্তা দেন দেশটির ৩৬ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।
তিনি উল্লেখ করেন, হিমবাহের পিছু হটা, ভঙ্গুর পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং নদীর অনিয়মিত প্রবাহই প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপালকে কী পরিমাণ উচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে।
গত চার দশকে নেপালে প্রায় ২৬টি হিমবাহ হ্রদ ফেটে ভয়াবহ বন্যার ঘটনা ঘটেছে। প্রতি বছর চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়াজনিত দুর্ঘটনায় গড়ে ৩০০টিরও বেশি প্রাণহানি এবং লাখ লাখ ডলারের সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।
সবশেষ বন্যায় অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ রাস্তাঘাট, সেতু, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার জন্য অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা নেপালের অন্তত ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো প্রতিনিয়ত গলে পিছিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আলগা পাথর ও বরফের প্রাকৃতিক বাঁধে ঘেরা ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ তৈরি হচ্ছে—যেগুলোর ঠিক নিচেই উপত্যকাসমূহে বসবাস করছেন লাখ লাখ মানুষ।
হিমবাহ, হিমবাহ হ্রদ এবং আকস্মিক বন্যা বিষয়ক 'ইসিমোড'-এর অবসরপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ সামজওয়াল রত্ন বজ্রাচার্য জানান, হ্রদগুলোর পানির স্তর ৩ মিটার (১০ ফুট) কমাতে পারলে দুর্যোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
তিনি বলেন, 'এই হ্রদগুলো খুব দ্রুত আকৃতিতে বড় হচ্ছে এবং হিমালয়ের অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করছে। ভূমিকম্প, হিমধস, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা অপরিকল্পিত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে এগুলো যেকোনো মুহূর্তে ফেটে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।'
