মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বিষাক্ত ইনজেকশনের পরও বেঁচে যাওয়া মার্কিন নারী এখন অচেতন, আছেন ভেন্টিলেটরে
পরপর দুটি বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্রিস্টা পাইককে বৃহস্পতিবার রাতে ইনটিউবেটেড করে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছে। তিনি তখন অচেতন ছিলেন। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে তার আইনজীবীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
৫০ বছর বয়সি ক্রিস্টা পাইকের শরীরে বুধবার প্রাণঘাতী ইনজেকশনের দুটি ডোজ পুশ করা হলেও তিনি বেঁচে যান। এরপর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পাইকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ন্যাশভিল এলাকার একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।
কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার এই ব্যর্থ চেষ্টার পর পাইকের আইনজীবীরা এখন তার সাজা কমানোর আবেদন জানাচ্ছেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই ব্যর্থ চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত 'যাবতীয় প্রমাণ' সংরক্ষণের জন্য শুক্রবার জরুরি আবেদন দায়ের করেছেন পাইকের আইনজীবীরা।
আদালতের ওই নথিতে বলা হয়েছে, পাইকের জীবন বাঁচাতে এবং তার শরীর থেকে ব্যবহৃত ওষুধের বিষক্রিয়া দূর করতে হাসপাতালের কর্মীরা কাজ করছেন।
আইনজীবীরা জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করার সময় কারা কর্মকর্তারা পাইকের শরীরে অন্তত সাতটি সুই ফুটিয়ে ইন্ট্রাভেনাস (আইভি) লাইন বসানোর চেষ্টা করেছিলেন।
একপর্যায়ে পাইক নিজেই তাদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন শরীরের ঠিক কোন জায়গায় সুই ফোটালে কাজ হতে পারে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, 'শরীর থেকে বের করার সময় একটি সুই ৯০ ডিগ্রি কোণে বেঁকে গিয়েছিল।'
আইনজীবীরা জানান, দুটি ডোজ প্রয়োগের সময় 'পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই তাকে কাঁদতে, গোঙাতে এবং জোরে জোরে শ্বাস নিতে শোনা যাচ্ছিল।'
টেনেসির গভর্নর বিল লি পাইকের এই ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি চলতি বছরের জন্য ওই অঙ্গরাজ্যের সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
তবে অঙ্গরাজ্যটির ডিপার্টমেন্ট অভ কারেকশন তাদের ব্যবহৃত পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, 'প্রটোকলে যতটুকু করার কথা বলা আছে, তার বাইরে অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতির সুযোগ নেই।'
ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আবারও চেষ্টা চালাবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ। এমনকি পুরো প্রক্রিয়ায় আসলে কী ভুল হয়েছিল, সে সম্পর্কেও তারা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
পাইকের আইনজীবীরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, থ্রম্বোসাইটোসিস ও ছোট শিরার মতো শারীরিক সমস্যার কারণে বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগের সময় তাকে 'অপ্রয়োজনীয়' ব্যথা ও তীব্র যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
আদালতে জমা দেওয়া সর্বশেষ নথিতে তার আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, 'মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দলের কোনো সদস্য একবারের জন্যও বুঝতে পারেননি যে আইভি লাইনগুলো সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি বা শিরাগুলো ফেটে গিয়েছিল এবং পেন্টোবারবিটাল ওষুধটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পাইকের শরীরে প্রবেশ করছিল।'
তারা সংশ্লিষ্ট সমস্ত ভৌত, লিখিত ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ সংরক্ষণের অনুরোধ জানাচ্ছেন।
পাইকের পক্ষের আইনজীবীদের পরামর্শক অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ড. জোয়েল জিভট বলেন, ওই বিষাক্ত ওষুধের দুটি ডোজই যথেষ্ট ছিল। এটি যদি স্বাভাবিক রক্ত চলাচলের মাধ্যমে তার রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করত, তবে 'নিশ্চিতভাবেই তার মৃত্যু হতো'।
জিভট বলেন, ক্রিস্টা পাইকের বেঁচে যাওয়ার একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, 'রক্তে পেন্টোবারবিটালের মাত্রা কখনোই মৃত্যু ঘটানোর মতো যথেষ্ট বেশি ছিল না।' এছাড়া ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তার বাহুতে হওয়া ফোসকাগুলো থেকে বোঝা যায় যে তার কোনো শিরা ফেটে গিয়েছিল।
তাই ওই ওষুধ পাইকের রক্তপ্রবাহে প্রবেশের পরিবর্তে সম্ভবত তার ত্বকের নিচের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান তিনি।
থ্রম্বোসাইটোসিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে পাইকের শারীরিক অবস্থাও এখানে ভূমিকা পালন করতে পারে। ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে রক্ত জমাট বাঁধার ফলে সম্ভবত পেন্টোবারবিটাল তার শিরায় প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।
শেষ মুহূর্তে পাইকের আইনজীবীদের করা একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জ ব্যর্থ হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ বন্ধ করার দুটি পৃথক প্রচেষ্টা নাকচ করে দেয়।
টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে একমাত্র নারী পাইকের প্রাণভিক্ষার আবেদনও নাকচ করে দেন অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর।
১৯৯৫ সালে পাইক ও তার তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপ মিলে ১৯ বছর বয়সি স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন ও হত্যা করেন। তখন পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর।
টেনেসির নক্সভিলে এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হওয়ার পর পরের বছর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের আগে পাইক অভিযোগ করেছিলেন, স্লেমার তাকে অপমান করেছেন এবং তার তৎকালীন প্রেমিককে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পাইকের প্রেমিক ও মামলার সহ-আসামি শিপের বয়স ওই সময় ১৭ বছর হওয়ায় অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পান।
শিপকে প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এখন তিনি কারাগারেই আছেন।
