ইরান যুদ্ধে আহতের তালিকায় গোপনে আরো ৩৭ সেনার নাম যোগ করল যুক্তরাষ্ট্র; মোট আহত ৮৬১
প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই এ সপ্তাহে ইরান যুদ্ধ চলাকালে আহত হওয়া সেনাসংখ্যার সরকারি তালিকায় নীরবে আরও ৩৭ জনকে যোগ করেছে পেন্টাগন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংঘাত ও অন্যান্য বৈদেশিক সামরিক অভিযানে নিহত ও আহত কর্মী সংক্রান্ত পেন্টাগনের সরকারি ডেটাবেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তালিকায় নতুন যোগ হওয়াদের মধ্যে ২৯ জন নৌবাহিনীর নাবিক এবং ৮ জন মেরিন সেনা। এই ওয়েবসাইটটির নাম 'ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালিসিস সিস্টেম' (ডিসিএএস)।
ডিসিএএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ চলাকালে মোট আহত সেনাসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬১ জনে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা পেন্টাগনের ডাটাবেসে 'ওভারসিজ অপারেশন্স' (বৈদেশিক সামরিক অভিযান) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—যেগুলো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে জুলাই মাসের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ঘটেছে (যা পরবর্তীতে ভেস্তে যায়)। এর আগে, নিহত ও আহত সেনাদের হিসাব রাখা হতো 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-এর অধীনে—যা ইরান যুদ্ধের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া নাম ছিল।
ডিএসিএএস ডেটাবেসে এই ৩৭ জন সেনা কীভাবে বা কখন আহত হয়েছেন—তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, নির্দিষ্ট না করা এসব আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও সব নাবিকই পুনরায় দায়িত্বে ফিরে এসেছেন।
যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রশাসনের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বারবার দাবি করে আসছেন যে এটি কোনো 'যুদ্ধ' নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ৩ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেন, 'বর্তমানে কোনো সক্রিয় গোলাগুলি বা হামলা চলছে না।'
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এর আগে জানান, ডিএসিএএস-এ তথ্য অন্তর্ভুক্ত হতে বিভিন্ন কারণে কয়েক দিন বা তার বেশি দেরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কে আঘাতের তথ্য বিলম্বে পৌঁছানো, কারণ অনেক সময় এগুলোর উপসর্গ সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পায় না।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য পেন্টাগনের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো সাড়া দেননি।
নৌবাহিনী ও মেরিন কোর থেকে প্রশ্নগুলোর জন্য 'ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড'-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানগুলো তদারকি করে। তবে সেন্ট্রাল কমান্ডের একজন মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এই ৩৭ জন সেনা কীভাবে আহত হলেন তা স্পষ্ট করে—মার্কিন বাহিনীর ওপর সম্প্রতি এমন কোনো হামলা বা দুর্ঘটনার কথা সামরিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে প্রকাশ করেননি।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধে নিহত চার মার্কিন সেনার নাম পেন্টাগনের সরকারি তালিকা থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের সেনা হতাহতের হিসাব রাখার পদ্ধতিটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
গত সপ্তাহে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান সংঘাতের সময় মধ্যপ্রাচ্যে পেন্টাগনের প্রকাশ করা তথ্যের চেয়েও বেশি সংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। কর্মকর্তারা জানান, সামরিক বাহিনীর প্রায় পাঁচটি মৃত্যুর ঘটনা ডিএসিএএস ডাটাবেসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি—যা একটি অমীমাংসিত গরমিল হিসেবেই রয়ে গেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই প্রতিবেদনটিকে ভুল দাবি করে এই সাংবাদিকতাকে "জঘন্য" বলে আখ্যায়িত করেন।
সেই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ডাটাবেসে দেখা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে শত্রুভাবাপন্ন ও অ-শত্রুভাবাপন্ন উভয় কারণে ১৮ জন মার্কিন সেনা মারা গেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপ্রকাশিত এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর সবকটিই সরাসরি ইরান সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে এতে সংঘাতের মাঝে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার সময় বিমানে এক সেনা কর্মকর্তা স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থার মুখোমুখি হয়ে মারা যাওয়ার পর এ সপ্তাহে ডিএসিএএস-এ নিহতের মোট সংখ্যা বাড়িয়ে ১৯ করা হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, ডিএসিএএস ডাটাবেসে নথিভুক্ত অ-শত্রুভাবাপন্ন মৃত্যুর মধ্যে দুর্ঘটনা, হঠাৎ স্বাস্থ্য জটিলতা বা আত্মঘাতী ক্ষতসহ আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। অতীত সংঘাতগুলোতে এই ধরনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হতো যাতে আমেরিকার সাধারণ মানুষ সেনা সদস্য ও তাদের পরিবারগুলোর দেওয়া আত্মত্যাগের একটি স্বচ্ছ ও স্পষ্ট চিত্র পেতে পারে।
জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে, আমেরিকান জনগণের কাছে ইরান যুদ্ধ অত্যন্ত অপ্রিয় এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক দায় হতে পারে।
বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাংবাদিকদের জানান, শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের প্রতি একটি ইতিবাচক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
