মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ পেলেন সাবেক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের (মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স) প্রথম মহাসচিব হিসেবে পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নোমান মাহমুদকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বুধবার পাকিস্তানের এ খবর জানিয়েছে।
পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রিয়াদে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এই জোটের সাধারণ সচিবালয়ে নেতৃত্ব দেবেন নবনিযুক্ত এই মহাসচিব।
গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিশ্চিত করেছিলেন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোটের মহাসচিব হবেন পাকিস্তান থেকে। এরপরই এই নিয়োগ দেওয়া হলো।
গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা মক্কা প্রতিরক্ষা জোট।
গত মাসে ইস্তাম্বুলে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে গঠিত স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল অ্যান্ড ডিফেন্স কমিটির প্রথম বৈঠক হয়।
উচ্চপর্যায়ের এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এবং সেনাপ্রধান ও চিফ অভ ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির।
উদ্বোধনী এই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, তুরস্কের জাতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলার ও চিফ অভ দ্য টার্কিশ জেনারেল স্টাফ সেলসুক বায়রাকতারোগলু।
এই তিন দেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং তিন মিত্র দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রতিশ্রুতি।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছিলেন, তুরস্ক আশা করছে 'পরের ধাপে' মিসরও এই জোটে যোগ দেবে। তিনি আরও জানান, মিসরের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল 'কিছু কারিগরি বিষয়' বাধা হয়ে আছে।
বাংলাদেশও এই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর বলেছেন, নিজস্ব স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল গতিশীলতা বিবেচনা করে এই তিন দেশের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
কে এই নোমান মাহমুদ
নোমান মাহমুদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব, গোয়েন্দা কার্যক্রম, কৌশলগত বিশ্লেষণ ও পেশাদার সামরিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বেলুচ রেজিমেন্টের এই কর্মকর্তা ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। তিনি কোয়েটার কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ, মিসরের কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ ও ইসলামাবাদের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির স্নাতক। পাশাপাশি যুদ্ধবিদ্যা (ওয়ার স্টাডিজ) বিষয়ে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।
নোমানের কর্মজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে। সেখানে প্রধান প্রশিক্ষক হওয়ার আগে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
মেজর জেনারেল হিসেবে তিনি উত্তর ওয়াজিরিস্তানে একটি পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
পরবর্তী পদায়ন নোমানকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে গোয়েন্দা পরিমণ্ডলে নিয়ে যায়। ওই সময় তাকে ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স-এর (আইএসআই) অ্যানালাইসিস ডিরেক্টরেটের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আইএসআইয়ে তার কাজের অংশ ছিল জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশের ঘটনাবলি মূল্যায়ন করা, যা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক ছিল। এই পদে থাকার সুবাদে আইএসআইয়ের বৈদেশিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথেও তার সংযোগ স্থাপিত হয়।
২০১৯ সালের এপ্রিলে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পান এবং সেনা সদরদপ্তরে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মহাপরিদর্শক হিসেবে নিযুক্ত হন। একই বছরের ডিসেম্বরে তিনি পেশোয়ারের একাদশ কোর-এর নেতৃত্ব নিতে সেখানে বদলি হন।
কোর কমান্ডার হিসেবে তার মেয়াদকাল ছিল পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের অন্যতম সংবেদনশীল একটি সময়। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তান সীমান্ত বেড়ার কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট নিরাপত্তাজনিত প্রভাব সামাল দিচ্ছিল।
২০২১ সালের নভেম্বরে নোমান একাদশ কোরের দায়িত্ব ছাড়েন। পরে ইসলামাবাদের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার আগপর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।
২০২২ সালের সর্বশেষ পালাবদলের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান পদে পদোন্নতির সম্ভাব্য দৌড়ে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি।
