নিজেই নিজের উত্তরসূরি তৈরি করছে এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’: অ্যানথ্রপিক
মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের আরও বুদ্ধিমান ও উন্নত করার পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবট 'ক্লড'। শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান 'অ্যানথ্রপিক' জানিয়েছে, তাদের নতুন মডেল উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) ২৬ শতাংশেরও বেশি কাজ এখন সরাসরি পরিচালিত হচ্ছে তাদের নিজস্ব 'ক্লড'-এর নেতৃত্বে। মাত্র কয়েক মাস আগেও যেখানে এই হার শূন্য ছিল, সেখান থেকে এই অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটেছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে অ্যানথ্রপিক জানায়, নতুন এআই মডেল তৈরির কাজে ক্লডের ভূমিকা মূল্যায়নে দেখা গেছে প্রায় ২৬ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে মানুষের ভূমিকা ছিল কেবল তদারকি করা এবং উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা দেওয়া। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও এই কাজের পরিমাণ ছিল শূন্য।
প্রযুক্তি বিশ্বে এই ধারণাকে বলা হয় 'রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট' বা এআই কর্তৃক মানুষের সাহায্য ছাড়া নিজে থেকেই নিজের সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা। অ্যানথ্রপিক সতর্ক করে বলেছে, 'মডেলগুলো যদি তাদের নিজস্ব বিকাশকে এভাবে দ্রুত ত্বরান্বিত করতে থাকে, তবে মানুষের পক্ষে এই সিস্টেমগুলোকে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই বিশ্ব স্বয়ংক্রিয় এআইয়ের কতটা কাছাকাছি চলে এসেছে, তা সবার সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।'
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই গত সপ্তাহান্তে শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোকে এই প্রযুক্তির ওপর কাজের গতি সমন্বিতভাবে ধীর করার আহ্বান জানান, যাতে এআই-এর চারপাশে সুরক্ষাবলয় তৈরির জন্য আরও বেশি সময় পাওয়া যায়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিরা দ্রুত এই ধারণাকে সমর্থন করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেন।
বৃহস্পতিবার এক ব্লগ পোস্টে নতুন এআই মডেলগুলোর ওপর অ্যানথ্রপিকের গবেষণা ও উন্নয়নে ক্লডের অবদানের কথা প্রকাশ করা হলেও, কোম্পানিটি এটি জানায়নি যে রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্টের ঠিক কতটা কাছাকাছি তারা পৌঁছেছে বলে মনে করে। তারা জানিয়েছে, বর্তমানে কোনো পর্যায়েই মানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া ক্লড 'সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিতভাবে' কাজ করেনি।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে ক্লড প্রায় ২৬ শতাংশ ক্ষেত্রে সেই কাজের 'নেতৃত্ব' দিতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে মানুষ কেবল তদারকির ভূমিকা পালন করেছে এবং উচ্চপর্যায়ের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ব্লগ পোস্টে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মতো অতি সাম্প্রতিক সময়েও এই সংখ্যাটি ছিল শূন্য।
কোম্পানিটি বলেছে, 'মডেলগুলো তাদের নিজস্ব বিকাশকে ত্বরান্বিত করলে তা মানুষের পক্ষে এই সিস্টেমগুলোকে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে। তাই রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্টে পৌঁছানোর কতটা কাছাকাছি বিশ্ব রয়েছে তা বোঝার জন্য এই মেট্রিকস বা পরিসংখ্যানগুলো প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মানুষ তাদের ফলাফল যাচাই করার আগে, একটি বাইরের এআই কোম্পানির তৈরি রেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ পরিমাপ করতে তারা ক্লডের একটি সংস্করণ ব্যবহার করেছে।
কোম্পানিটি আরও প্রকাশ করেছে যে, গবেষণা ও প্রকৌশলগত কাজ পরিচালনা করার জন্য তাদের প্রায় ৩০,০০০ এআই 'এজেন্ট' রয়েছে এবং সম্প্রতি তারা গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করা কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রায় ৬ শতাংশ নিরাপত্তা কাজের দিকে নির্দেশিত করেছে।
অ্যানথ্রপিক অন্যান্য এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও স্ব-উন্নতশীল এআই এবং সংস্থান বরাদ্দের অগ্রগতি সম্পর্কে অনুরূপ তথ্য প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে বলে মনে হয়।
কোম্পানিটি বলেছে, 'যেকোনো ফ্রন্টিয়ার ডেভেলপার একটি উন্মুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করে নিয়মিত এই পরিমাপগুলো প্রকাশ করতে পারে। আমরা এই পরিমাপগুলো প্রকাশ করছি কারণ এগুলো সাধারণ মানুষ, তৃতীয় পক্ষ এবং সরকারগুলোকে ফ্রন্টিয়ার ল্যাবগুলোর ভেতরে এআই বিকাশের গতির বিষয়ে আরও ভালো স্বচ্ছতা দেয়।'
এআই মানুষের জন্য—বা সামগ্রিকভাবে মানবতার জন্য—কী ধরনের সম্ভাব্য বিপদ তৈরি করতে পারে তা নিয়ে প্রযুক্তি শিল্প এবং ওয়াশিংটনজুড়ে এক সপ্তাহ ধরে চলা বিতর্কের পর কোম্পানির এই প্রস্তাবগুলো সামনে এল।
গত সপ্তাহে অ্যানথ্রপিকের এক কর্মী পদত্যাগ করেন এবং বলেন যে কোম্পানিটি 'আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে।' এই উদ্বেগ পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স (আই-ভারমন্ট) চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিফেন কে. ব্যাননের সাথে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন।
অ্যানথ্রপিক এবং চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই-সহ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোও অভ্যন্তরীণ এজেন্টরা পরীক্ষায় কিংবা বিভিন্ন কাজ করার সময় 'সদাচরণ' করছে কি না, তা নিশ্চিত করার ক্ষমতার বিষয়ে তদন্ত ও কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছে। ওপেনএআই গত বুধবার তাদের এআই এজেন্টদের কাজে জালিয়াতি করার বা নির্দেশনার বাইরে চলে যাওয়ার নতুন কিছু উদাহরণ প্রকাশ করেছে এবং এমন একটি রূপরেখা জারি করেছে যার অধীনে তারা এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রকাশ করবে।
অ্যানথ্রপিক বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা বেশ কয়েক ধরনের স্বায়ত্তশাসিত অভ্যন্তরীণ মনিটর নিয়োগ করেছে যা মানুষের পর্যালোচনার জন্য সন্দেহজনক কার্যকলাপ চিহ্নিত করে তা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পাঠাতে পারে।
