তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে যুক্তরাজ্যে শিক্ষায়, অর্থনীতিতে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের নীরব বিপ্লব; এগিয়ে যাচ্ছেন শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে
১৯৮৭ সালে বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লস পূর্ব লন্ডনের স্পিটালফিল্ডস এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। ১৯৪৫ সাল থেকে সেখানে অনেক বাংলাদেশি বসতি গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, "তারা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মতো প্রায় একই রকম খারাপ পরিবেশে কাজ করছে এবং বসবাস করছে। এটি সত্যিই অগ্রহণযোগ্য।"
বর্ণ বৈষম্য নিরসন কমিশন নামে একটি সরকারি সংস্থা পরবর্তীতে উল্লেখ করেছিল যে বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং কর্মসংস্থানের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম ছিল।
১৯৮৫ সালে সরকারের জন্য তৈরি করা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত অর্জন ছিল "খুবই নিম্নমানের"। অনেক শিশু বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে ব্রিটেনে এসেছিল এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। তারা ইংরেজি ভাষায় দুর্বল ছিল। কিছু শিক্ষকও তাদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রত্যাশা করতেন না। তাদের বাবা-মায়েরা তাদের স্থানীয় স্কুলগুলোতেই ভর্তি করাতেন, কারণ তারা শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের হামলার আশঙ্কা করতেন।
অনেক বাংলাদেশি এখনও দরিদ্র রয়ে গেছেন। আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরও প্রতি দুইজনের একজনের আয় জাতীয়ভাবে সর্বনিম্ন এক-পঞ্চমাংশ আয় করা মানুষের দলে পড়ে। মধ্যম অবস্থানের একটি বাংলাদেশি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ পাউন্ডেরও কম, যেখানে সব জাতিগত জনগোষ্ঠী মিলিয়ে এই গড় পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশিরা এখনও মূলত পূর্ব লন্ডনেই বসবাস করেন। তবে তাদের যদি একই জায়গায় আটকে থাকা জনগোষ্ঠী বলে মনে হয়, সেটি আসলে একটি ভ্রান্ত ধারণা।
বর্তমানে তরুণ বাংলাদেশিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চমৎকার ফলাফল করছে। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে তারা ১৬ বছর বয়সে সাধারণত যে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়, সেই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সমান ফল করতে শুরু করে। এখন তারা আরও ভালো করছে। ২০২১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ।
ক্রমবর্ধমান সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছে এবং এমন সব বিষয় পড়ছে, যেগুলো থেকে ভালো চাকরির সুযোগ রয়েছে। গত এক দশকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দন্তচিকিৎসা বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন গুণ হয়েছে।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর পূর্বে দরিদ্র থাকার এবং এখনও দরিদ্র থাকার একটি বড় কারণ হলো অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা কর্মহীন। তবে সেটিও এখন পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২১ সালের আদমশুমারি দেখিয়েছে যে যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশিদের ৬৮ শতাংশ কর্মরত ছিল, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭৯ শতাংশ। পুরো বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের হার কম, কারণ এই বয়সী অভিবাসী নারীদের মাত্র ৩২ শতাংশ কর্মরত ছিলেন।
শিক্ষাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশিদের ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে পারে। তবুও যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারীরা খুব একটা খারাপ করছে না।
সর্বশেষ আদমশুমারিতে, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ১৪ শতাংশ পেশাদার বা ব্যবস্থাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের হারের প্রায় হুবহু সমান।
২০১০-১১ সাল থেকে ইংলিশ বিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গতিশীল শহরে বসবাস করাও বাংলাদেশিদের জন্য সহায়ক হয়েছে। ব্রিটেনের পাকিস্তানিরা তুলনামূলকভাবে বেশি বসবাস করেন উত্তর ইংল্যান্ডের শিল্প-পরবর্তী শহরগুলোতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের ফলাফলও তুলনামূলকভাবে কম ভালো। তবে তারাও শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ছাড়িয়ে গেছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক আনিসা বাট বলেন, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীরা বিয়ের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তার ভাষায়, "আপনি যত বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন হবেন, তত বেশি কাঙ্ক্ষিত হবেন।"
যখন কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ দ্রুতগতিতে একটি দেশে অভিবাসন করে এবং এরপর মোটামুটি নতুন করে অভিবাসন বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই জনগোষ্ঠীর অগ্রগতি সাধারণত স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
১৯৭০-এর দশকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে নিষ্ঠুরভাবে বিতাড়িত এশীয়রা ব্রিটেনে তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য যথার্থভাবেই প্রশংসিত। ২০০০-এর দশকে ব্রিটেনে আসা বিপুলসংখ্যক পূর্ব ইউরোপীয়রাও কিছুটা প্রশংসার দাবিদার। সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী পোলিশরা শুরুতে মূলত শ্রমজীবী শ্রেণির চাকরি করত। কিন্তু এখন তাদের আয় ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া মানুষের গড় আয়ের চেয়ে সামান্য বেশি।
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে আসা মানুষ এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনে বসবাস করা মানুষ—দুই ধরনের মানুষই রয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেক ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এই অনুপাত একই।
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীতে নিয়মিত নতুন অভিবাসীরা যুক্ত হওয়ায় এবং পুরোনো প্রজন্মের সঙ্গে নতুন অভিবাসীদের একসঙ্গে হিসাব করায় তাদের ব্রিটিশ সমাজে একীভূত হওয়ার অগ্রগতি সহজে চোখে পড়ে না।
কিন্তু এই অগ্রগতি বাস্তবেই ঘটছে।
