সংঘাত বাড়ছে, হরমুজে জাহাজে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের
ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। প্রায় এক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর গত সপ্তাহে পুনরায় শুরু হওয়া উত্তেজনার অংশ হিসেবে শনিবার আবার এই সংঘাত ঘটে।
মার্কিন মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট দুটি তেলের ট্যাঙ্কার 'স্থায়ীভাবে অকেজো' করে দিয়েছে, যার একটি খারগ দ্বীপের কাছাকাছি অবস্থিত। এ ছাড়া ওমান উপসাগরে থাকা তৃতীয় আরেকটি ট্যাঙ্কার 'সম্পূর্ণ ধ্বংস' করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এই হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। তেহরান দাবি করেছে, এর জবাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে 'অননুমোদিত' রুট ব্যবহার করে যাওয়া আরও তিনটি তেলের ট্যাঙ্কারে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান কর্তৃক মার্কিন জাহাজে হামলার দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানের কোনো কূটনৈতিক লক্ষণ না দেখা গেলেও, হামলার আগের দিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতকে একটি 'তুচ্ছ বিষয়' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। শনিবারের নতুন হামলার বিষয়ে ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
ইরানের এই পাল্টা হামলার খবর আসার কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, 'এটি খুব সহজ: ইরান যদি মার্কিন জাহাজে গুলি চালায়, তবে আমরা তাদের তেলের ট্যাঙ্কার ধ্বংস (এবং ডুবিয়ে) দেব।' মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি, ইরান-সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলের ট্যাঙ্কারে হামলার আগে সেন্টকমের দুটি যুদ্ধজাহাজ ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।
সেন্টকম জানায়, ওই দিন ভোরে আইআরজিসির (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তারা 'সফলভাবে প্রতিহত' করেছে, যা একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি এবং গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী জাহাজ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল। এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারকিকারী সেন্টকম দাবি করেছে, ধ্বংস করা তিনটি ইরানি তেলের ট্যাঙ্কার মূলত আইআরজিসি এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সিদের অর্থায়নকারী একটি বিলিয়ন ডলারের ছায়া নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম 'আইরিব' জানিয়েছে, খারগ দ্বীপের কাছে মার্কিন হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। উল্লেখ্য, এই খারগ দ্বীপ হলো ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল। দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে এবং মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপের সাহায্যে পরিবাহিত হয়। ওমান উপসাগরে আক্রান্ত অন্য দুটি ট্যাঙ্কারের ক্রুদের লাইফবোটের সাহায্যে তীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি ট্যাঙ্কার খালি ছিল এবং অন্যটিতে তেল বোঝাই ছিল।
এর কয়েক ঘণ্টা পর আইরিব জানায়, আইআরজিসি ওই অঞ্চলে ছয়টি জাহাজে পাল্টা হামলা চালিয়েছে—যার মধ্যে তিনটি তেলের ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালিতে এবং তিনটি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট জাহাজ অন্যান্য এলাকায় অবস্থিত। আইআরজিসির দাবি, তেলের ট্যাঙ্কার তিনটি প্রণালির অননুমোদিত রুট ব্যবহার করছিল এবং অন্যান্য জাহাজকেও এই রুট ব্যবহার না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কার্যত বন্ধ রয়েছে এবং এটি এখন ইরানের জন্য দরকষাকষির একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, তারা এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই ছেড়ে দেবে না। এর আগে তারা ওমানি জলসীমা ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতেও হামলা চালিয়েছিল। তবে ইরানি হামলা সত্ত্বেও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে প্রণালিটি 'উন্মুক্ত' রয়েছে এবং মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে পারাপারে সহায়তা করছে।
আপেক্ষিক শান্ত পরিবেশের পর গত রবিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা শুরু করে। মঙ্গলবারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও একটি 'ভয়াবহ হামলা' চালিয়েছে, তবে এই লড়াই 'বেশি দিন' স্থায়ী হবে না। মার্কিন হামলার পর ইরানও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলায় একটি বিয়েবাড়িতে দুই শিশুসহ চারজন নিহতের ঘটনায় ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই বেসামরিক মৃত্যুর খবরে তিনি 'অত্যন্ত সন্দিহান', তবে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি তদন্ত করবে। অন্যদিকে, মানবিক সংস্থা ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার সিরিকে একটি বাড়ির বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের স্প্লিন্টার এসে আঘাত হেনেছিল, যাকে তেহরান 'যুদ্ধাপরাধ' বলে অভিহিত করেছে।
গত মাসে মার্কিন ও ইরানের মধ্যকার ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে ইরান এবং তাদের সাথে লেনদেনকারী যেকোনো দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। গত শুক্রবার ট্রাম্প মার্কিন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এই সংঘাত কোনো 'যুদ্ধ' নয়। তিনি বলেন, 'আমি এটিকে একটি সামরিক সংঘাত বলছি কারণ এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়। এটি বড় কিছু নয়।'
বিশ্বের তেল ও এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ পারাপার হওয়া এই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধের পেছনে আমেরিকান ভোক্তাদের বিপুল ব্যয় ট্রাম্পকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় মূল্য রেকর্ড ৫.৮৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে গড়ে ৩.৭১ ডলার ছিল।
