ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় শিশুসহ নিহত ৫, আহত অন্তত ৬৩
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন সামরিক বাহিনী বোমাবর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে তেহরান। গত বুধবার ভোরের দিকে চালানো এই হামলায় এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন—বেসামরিক এই বিয়ের বাড়িতে চালানো 'নিষ্ঠুর' হামলায় নারী ও শিশুসহ ৫০ জনেরও বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম 'প্রেস টিভি' নিশ্চিত করেছে যে হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হোসেন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, 'শহীদদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। হামলার পর ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।'
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে—বোমার আঘাতে একটি বহুতল ভবনের দেয়াল ও জানালা সম্পূর্ণ উড়ে গেছে এবং চারপাশের মাটিতে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সংস্থাটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেশ কয়েকটি আহত শিশুর ছবিও প্রকাশ করেছে।
সিরিক কাউন্টির গভর্নর রেজা শাহিদিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি-কে জানিয়েছেন—হামলায় মোট ৬৩ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫০ জনই নারী ও শিশু। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত পার্শ্ববর্তী মিনাব শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা 'ফার্স নিউজ' এই হামলায় বেঁচে যাওয়া এক শিশুর জবানবন্দি প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে শিশুটি জানায়, বিয়ের অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর ঠিক আগেই সে আকাশে যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছিল।
সে বলে, 'আমরা যখন অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালাম, ঠিক তখনই এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটল। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল। ইট, পাথর ও সিমেন্টের টুকরো এসে আমার মুখে ও মাথায় আঘাত করে এবং আমাদের আশেপাশে থাকা অনেকেই রক্তাক্ত হন। সেখানে উপস্থিত সবাই সাধারণ বেসামরিক মানুষ ছিলেন।'
এই হামলার বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে—তারা ইরানের ওপর নতুন দফায় 'সামরিক লক্ষ্যবস্তু'তে বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিনদের দাবি, পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর হামলার চেষ্টার জবাবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে—তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার সিস্টেম, নৌ-সম্পদ, মাইন স্থাপনকারী জাহাজ এবং যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ বহাল রেখেছে, যা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের তীব্র সংঘাত চলছে।
ইরানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে—তারা এই মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডান, বাহরাইন এবং ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েতও তাদের আকাশসীমায় বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে।
ইরানের মুখপাত্র বাঘাই এই মার্কিন বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কড়া পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ এবং লামের্দ শহরের একটি স্পোর্টস হলে হামলায় ২১ জন নিহত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এই নৃশংসতা অতীতের ধারাবাহিক বর্বরোচিত অপরাধগুলোরই অংশ।'
মুখপাত্র বাঘাই হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'ইরান এই পৈশাচিক অপরাধের দৃঢ় ও উপযুক্ত জবাব দেবে। তবে যেসব দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই বর্বরতার মুখে নীরব রয়েছে, তাদের বুঝতে হবে যে এই নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং অপরাধের লাইসেন্স দেওয়া।'
কুহেস্তাক ছাড়াও পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় শহর কোনারাক, বন্দর আব্বাস, জাস্ক, আসালুয়েহ, আহভাজ এবং চাবাহার ও কিশ দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত পয়েন্টগুলোতেও প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ও হামলার খবর দিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা 'তাসনিম নিউজ'।
